Showing posts with label মা. Show all posts
Showing posts with label মা. Show all posts

Tuesday, September 02, 2025

স্বপ্না দত্ত, আমার মা: সপ্তম অধ্যায়, প্রথম পরিচ্ছেদ

২৯ মহানির্বাণ মঠ রোড, কলকাতা ৭০০০২৯। এই বাড়িতে আমার জন্ম হয়েছিল শুক্রবার, ১৩ নভেম্বর ১৯৮৭, সকাল ৯টা ১০ মিনিটে। বললাম বটে, আমার জন্ম হয়েছিল এই বাড়িতে। কিন্তু সঠিক ভাবে দেখতে গেলে আমার জন্ম হয়েছিল রামকৃষ্ণ মিশন সেবা প্রতিষ্ঠান (শিশুমঙ্গল) হাসপাতালে। এই বাড়ি থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। 

দক্ষিণ কলকাতার গড়িয়াহাটের কিছুটা দূরে পণ্ডিতিয়া অঞ্চল। রাসবিহারী রোড বা কালীঘাটের দিক থেকে আসলে ট্রায়াঙ্গুলার পার্ক ক্রসিং–এর কাছে। কাছেই বিখ্যাত মন্দির মহানির্বাণ মঠ আর সেই থেকেই রাস্তার নাম মহানির্বাণ মঠ রোড বা মহানির্বাণ রোড।

২৯ মহানির্বাণ মঠ রোডের বাড়ি আমার বাবার কলকাতা শহরে পৈতৃক ভিটে। যতদুর সম্ভব আমার ঠাকুরদা আদিত্যচন্দ্র দত্ত এই বাড়ি তৈরি করিয়েছিলেন। এই বাড়ি যে শতাব্দী প্রাচীন তাতে কোনও সন্দেহ নেই। ঠিক কোন বছরে এই বাড়ি নির্মাণ হয় তা আমার জানা নেই। এই পৈতৃক বাড়ি বিক্রি করা হয় ১৯৯৩ বা ১৯৯৪ সালে। আজ এই বাড়ি পরিত্যক্ত, ভাঙা। কলকাতা কর্পোরেশনের তরফ থেকে বহু বছর আগেই একে "বিপজ্জনক ভঙ্গুর বাড়ি" তকমা লাগানো হয়েছে। যখন তখন ইঁট–পাথর খসে পড়তে পারে এবং পড়েও। এখনও সেই তকমা নিয়েই মহানগরীর বুকে জরাজীর্ণ এই বাড়ি কোনওক্রমে দাঁড়িয়ে আছে। 

আমার বাবা তরুণ দত্ত মারা যান সোমবার, ৪ মে ১৯৯৮। তার বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই, মানে বাড়ি বিক্রির পর থেকেই, জেঠু বা পিসিদের সাথে আমাদের যোগাযোগ নেই। এই পুরনো বাড়ির অনেক তথ্য হারিয়ে গেছে। অথচ এই বাড়িতেই আমার জীবনের প্রথম ৫‒৬ বছর কেটেছে। সুদূর শৈশবের স্মৃতি, খুব আবছা কিছু কথা মনে আছে। সেই স্মৃতির নির্বাচিত কিছু অংশ, বিশেষ করে যা আমার মাকে ঘিরে, লেখার চেষ্টা করবো। তার সাথে কিছু তথ্য, যতটা খুঁজে পাই, সংকলন করার চেষ্টা করবো। এই অধ্যায়টিকে একাধিক পরিচ্ছেদে বিভক্ত করার প্রয়োজন হবে।

কয়েকজন মহিলা ঘরের ভেতরে একসাথে বসে ও দাঁড়িয়ে আছেন। বেশিরভাগের পরনে শাড়ি, কারও কারও চোখে চশমা ও হাতে গয়না রয়েছে। বাঁদিকে এক বৃদ্ধা সাদা শাড়ি পরে বসে আছেন। সামনে লাল বা গাঢ় শাড়ি পরা কয়েকজন নারী বসে আছেন, আর পেছনে জানালার সামনে কয়েকজন দাঁড়িয়ে আছেন। মাঝখানে একটি শিশু দেখা যাচ্ছে। ছবিতে হালকা বেগুনি আভা রয়েছে এবং এটি ১৯৮০-এর দশকের পুরনো ছবি বলে মনে হয়।
আমার মায়ের বিয়ের দিনের ছবি। ১৯৮৪ সাল। 
মহানির্বাণ মঠ রোডের বাড়িতে। 
ছবির মাঝখানে লাল শাড়ি পরে বসে আছেন মা। 
জেঠিমা, পিসি এবং বাবার দিকের অন্যান্য আত্মীয়রা রয়েছেন। 

বাড়ির কথা

২৯ মহানির্বাণ মঠ রোডের এই বাড়ি ঠিক কোন সালে নির্মিত হয়, আমার জানা নেই। তবে, নির্দ্বিধায় বলতে পারি যে এই বাড়ির নির্মাণ ১৯১৫ বা তার আগে। 

আমার বাবার জন্ম ৪ মে ১৯৩৩। আমার বাবা তাঁর ভাই–বোনদের মধ্যে সব থেকে ছোট ছিলেন। আমার ঠাকুরদা এবং জেঠু পিসিদের অনেকের সঠিক জন্মসাল আমার জানা নেই। 

আমি ১৯৫৬ এবং ১৯৬১ সালের কলকাতার রাসবিহারী অ্যাভিনিউ অঞ্চলের ইলেক্টোরাল রোলের কপি পেয়েছি। আসুন, সেই ভোটার তালিকার তথ্যের ওপর ভিত্তি করে অতীতকে কিছুটা পুনরুদ্ধার করা যাক।

১৯৫৬ সালের রাসবিহারী অ্যাভিনিউ কেন্দ্রের ভোটার তালিকা, যেখানে মহানির্বাণ রোডের ভোটারদের নাম, বয়স ও ঠিকানা দেওয়া আছে।
১৯৫৬ সালের রাসবিহারী অ্যাভিনিউ কেন্দ্রের ভোটার তালিকা।
প্রেমিসেস নম্বর ২৯, আর সিরিয়াল নম্বর ৪২৪–৪৪৮ দেখবেন।

১৯৬১ সালের রাসবিহারী অ্যাভিনিউ কেন্দ্রের ভোটার তালিকা, যেখানে মহানির্বাণ রোডের ভোটারদের নাম, বয়স ও পারিবারিক তথ্য দেওয়া আছে।
১৯৬১ সালের ভোটার তালিকা। প্রেমিসেস নম্বর ২৯–এর তালিকা লক্ষ্য করবেন।

আপনি এই অংশটি এড়িয়ে যেতে পারেন। তবে পুরনো ডকুমেন্ট ঘেঁটে ৮০–১০০ বছরের পুরনো তথ্য খুঁজে বেড় করা কিছুটা কঠিন কাজ। তাই অনুগ্রহ করে একটু মনোযোগ দেবেন।

আমার ঠাকুরদা আদিত্যচন্দ্র দত্তের জন্ম হয়েছিল ১৮৯০ সালে। আমার ঠাকুরমা হিমাংশুবালা দত্তের জন্ম ১৮৯৮ সালে। আমার ঠাকুরদার বাবা, মানে আমার প্রপিতামহের নাম ছিল প্রফুল্লচন্দ্র দত্ত। প্রফুল্লচন্দ্রের সম্পর্কে আর কোনও তথ্য আমার কাছে এখন নেই। 

সাদা-কালো ছবি, অদিত্য চন্দ্র দত্ত জামা ও ধুতি পরে বসে আছেন এবং হিমাংশুবালা দত্ত শাড়ি পরে মাথা ঢাকা অবস্থায় ঘরের ভেতরে বসে আছেন, পেছনে পর্দা রয়েছে।
আমার ঠাকুরদা আদিত্যচন্দ্র দত্ত (বামদিকে) এবং ঠাকুরমা হিমাংশুবালা দত্ত (ডানদিকে)।

আমার সবথেকে বড়ো জেঠু অরুণকুমার দত্তের জন্ম ১৯১৮ সালে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার এক বছর আগে। অরুণকুমারের স্ত্রী, আমার বড় জেঠিমা, প্রতিমা দত্তের জন্ম ১৯২২। 

আমার মেজ জেঠু কল্যাণ দত্তের জন্ম ১৯২০ সালে। তাঁর স্ত্রী, আমার মেজ জেঠিমা, প্রীতিকণা দত্তের জন্ম ১৯২৭।

সেজ জেঠু শ্যামলকুমার দত্তের জন্ম ১৯২২ সালে। ইনি নাট্য এবং সংস্কৃতিচর্চার সাথে বিশেষ যুক্ত ছিলেন। ১৯৮৮ সালের শুরুর দিকে ইনি আত্মহত্যা করেন। এইখানে একটা তথ্য দিই। আমার জন্ম ১৩ নভেম্বর ১৯৮৭। আমার যে নাম "টিটো" এইটা আসলে আমার ডাকনাম। আমার ভালো নাম হওয়া উচিত ছিল অনির্বাণ দত্ত। জন্মের পর সাময়িকভাবে টিটো নাম দেওয়া হয়েছিল। সেজ জেঠু, শ্যামল দত্ত, এই নাম দিয়েছিলেন। ১৯৮৮ সালের প্রথম দিকের ঘটনা। আমার তখন কয়েক মাস মাত্র বয়স, আমার মায়ের কাছ থেকে এই ঘটনা শোনা। অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমার নামকরণ করা হবে। তার কিছু দিন আগে সেজ জেঠু একদিন দুপুরে মা আর আমাকে দেখতে এলেন। আমাকে কোলে নিয়ে কিছুক্ষণ বসে থেকে আমার মাকে বললেন— "স্বপ্না, দেখো, এই ছেলে, টিটো, একদিন খুব বড় মানুষ হবে। আমি হয়তো সেদিন থাকবো না। কিন্তু, টিটো নিশ্চয়ই খুব বড়ো হবে।" এই কথা শুনে মা একটু ভয় পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন— "সেজদা, আপনি এইরকম বলছেন কেন, যে আপনি থাকবেন না?" মা সেই দিনই তাঁর প্রশ্নের উত্তর পাননি। উত্তর পেয়েছিলেন এক সপ্তাহের মধ্যে। আমার সেজ জেঠু শ্যামল দত্ত গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করলেন। আমার বাবা সেজ জেঠুর গলার দড়ি কেটে তাঁর ঝুলন্ত মৃতদেহ নামিয়েছিলেন। এখন যেহেতু সেজ জেঠু আমার নাম টিটো দিয়েছিলেন, আর কিছু দিন পরেই মারা গেছিলেন, আমার ডাকনামটাই ভালো নাম হয়ে রইলো। আমার সেজ জেঠিমা অঞ্জলি দত্তের জন্ম হয়েছিল ১৯৩২ সালে।

সাদা-কালো প্রতিকৃতি, শ্যামল দত্ত চশমা পরে ঐতিহ্যবাহী পোশাকে হাসিমুখে তাকিয়ে আছেন।
শ্যামল দত্ত। আমার সেজ জেঠু। 
ইনি আমার নাম টিটো রেখেছিলেন। 

আমার চতুর্থ জেঠু অশোককুমার দত্তের জন্ম হয়েছিল ১৯২৪ সালে। ইনি সাংবাদিক ছিলেন। চণ্ডাশোক নামে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করতেন। ইনি একজন গণিকা মহিলাকে বিবাহ করেছিলেন। তার জন্য আমার ঠাকুরদা এনাকে হয় ত্যাজ্যপুত্র করেছিলেন বা করতে চেয়েছিলেন। এনার সংসার সুখের হয়নি। আমি বলছি ১৯৬০–এর দশকের কথা। তখন কলকাতা এবং বাঙালি সমাজ আরও বেশি সংরক্ষণশীল ছিল। বিয়ের কয়েক বছর কী ভাবে যেন জেঠিমা হারিয়ে যান। তাঁর সম্পর্কে আর কোনও তথ্য পাইনি। ১৯৫৬ এবং ১৯৬১ সালের ভোটার তালিকায়ও এনার নাম পাইনি। বোধ হয়, এই বাড়িতে থেকে এনার নাম নথিবদ্ধ হয়নি। অশোক জেঠুর এক মেয়ে হয়েছিল। সেই মেয়েও শৈশবে অল্প কয়েক বছর বয়সে জ্বরে ভুগে হঠাৎ মারা যায়। এরপর অশোক জেঠু সব ছেড়ে দিয়ে সন্ন্যাসী হয়ে বেরিয়ে যান। এরপর তাঁর দেখা বা তাঁর খবর কেউ কোনোদিন পায়নি। আমার মা–বাবার বিয়ে হয়েছিল ১৯৮৪ সালে। অশোক দত্তকে ঘিরে এইসকল ঘটনা এবং তাঁর গৃহত্যাগ, সবকিছু হয়েছিল ১৯৮৪–এর অনেক বছর আগে। আমার জেঠু–পিসিদের মধ্যে আমি ব্যক্তিগতভাবে অশোক দত্তকে নিয়ে সবথেকে বেশি আগ্রহী। তবে, আমার কাছে তথ্য অত্যন্ত সীমিত। 

আমার পঞ্চম জেঠু তাপসকুমার দত্ত, জন্ম ১৯২৯। তিনি বিবাহ করেন মাধবীলতা দত্তকে, জন্ম ১৯৩৯। আমার ষষ্ঠ জেঠু মানসকুমার দত্তের জন্ম ১৯৩২ সালে। আর ভাই–বোনদের মধ্যে সবথেকে ছোট, আমার বাবা, তরুণ দত্তের জন্ম ১৯৩৩ সালে।

আমার দুই পিসি ছিলেন অর্চনা দত্ত এবং সাধনা দত্ত। দুজনেরই জন্ম ১৯৩০ সালে। দুইজনের একই সালে জন্ম — এইখানে একটু তথ্যের অসঙ্গতি থাকতে পারে, আবার সঠিকও হতে পারে। তবে আমি ১৯৫৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসরণ করছি। এর থেকে নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র আমার কাছে আরে নেই। অর্চনা বিবাহ করেন রবি রায়কে, এবং সাধনা বিবাহ করেন চিত্তরঞ্জন ধরকে। 

আমার ঠাকুরদা আর ঠাকুরমা দুজনেরই মৃত্যু হয় আমার মা–বাবার বিয়ের (১৯৮৪) বেশ কিছু বছর আগে। ১৯৯৩–১৯৯৪ সালে যখন এই বাড়ি বিক্রি হচ্ছে তখন সেই টাকা সাত ভাইয়ের মধ্যে ভাগ হয়েছিল। পিসিরা কোনও ভাগ নেননি।

আমাদের আর্থিক অবস্থা সেই সময় ভালো ছিল না। বাড়ি বিক্রির যেই টাকা আমরা পেয়েছিলাম, তার একটা বড় অংশ আমাদের চলে গিয়েছিল ধার বাকি শোধ করতে। সেইটা এক অদ্ভুত সময় ছিল। আমার আবছা মনে আছে যে জেঠুদের পরিবার এক এক করে বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছিলেন, অন্য কোথাও বাড়ি বা ফ্ল্যাট কিনে। একটা বড় পরিবার, যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে একসাথে ছিলেন, ধীরে ধীরে ভেঙে আলাদা হয়ে যাচ্ছিলেন। আমার মনে আছে সেইসময় একজন করে আত্মীয় বাড়ি ছেড়ে চলে যেতেন, আর আমার বাবা আর মা দুঃখে কাতর হয়ে পড়তেন।

কলকাতার ২৯ মহানির্বাণ মঠ রোডের পুরনো দুই তলা বাড়ির ২০১৪ সালের প্যানোরামা দৃশ্য। বাড়ির দেয়াল জীর্ণ, সবুজ শাটার লাগানো, সামনের রাস্তায় গাড়ি দাঁড়ানো, আর প্রবেশদ্বারের পাশে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন।
২৯ মহানির্বাণ মঠ রোডের বাড়ি। 
২৫ জুন ২০১৪ তারিখে তোলা ছবি। প্যানোরামা ভিউতে বাড়ির দুইদিকের ছবি সংযুক্ত। 

বাড়ি বিক্রির পর আমরা চলে আসি হালতু কায়স্থপাড়ার একটা দুই কামরার ভাড়া ঘরে। বাহাদুর সিং নামক এক প্রোমোটার মহানির্বাণ মঠ রোডের বাড়িটা কিনেছিলেন। বাড়ি কেনার কয়েক বছর পর তিনি ব্যক্তিগত জীবনে কিছু সমস্যার সম্মুখীন হয়। কিছু আইনি এবং অন্যান্য জটিলতাও ছিল। ধীরে ধীরে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বাড়ি ভেঙে পড়তে থাকে। ২০০৬–২০০৭ সাল নাগাদ যখন ওই অঞ্চলে একবার গেছিলাম, দেখেছিলাম যে বাড়িটা "বিপজ্জনক ভঙ্গুর" নোটিস পেয়েছে। এখনও বাড়িটা ওই অবস্থাতেই রয়েছে। বেশ কিছু আইনি জটিলতা, আর প্রচুর প্রপার্টি ট্যাক্স আর নানা ট্যাক্স বাকি আছে। তাই নতুন করে কোনও প্রোমোটার বা ব্যক্তি কিনতে চাইছেন না বা পারছেন না। দিনে দিনে বাড়িটার কঙ্কাল আরও বেশি করে বেরিয়ে পড়ছে।

সপ্তম অধ্যায়, প্রথম পরিচ্ছেদ এইখানেই শেষ করলাম। চরৈবেতি। 

দ্রষ্টব্য: এই লেখাটি আপনি স্বপ্না দত্ত ওয়েবসাইটেও পড়তে পারেন।

স্বপ্না দত্ত, আমার মা (Swapna Dutta, my Mother)


This page was last updated on: 2 September 2025
Number of revisions on this page: 1
Internet Archive Backup: See here

Friday, August 29, 2025

স্বপ্না দত্ত, আমার মা: ষষ্ঠ অধ্যায়

২৭ অগাস্ট ২০২৫ — আমার মায়ের মৃত্যুর পর একমাস কেটে গেছে। এই সিরিজের লেখাগুলোতে আমার মায়ের সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করছি। তারই সাথে খুব চেষ্টা করছি যেন লেখাগুলো শুধুমাত্র কোনও বিশেষ ব্যক্তির রোজনামচা না হয়ে, বৃহত্তর জীবনকে স্পর্শ করার চেষ্টা করে। তাই, পূর্ব প্রকাশিত অধ্যায়গুলোতে হয়তো লক্ষ্য করেছেন যে অনেকটা অংশ জুড়ে মায়ের সম্পর্কে স্মৃতি ছাড়াও আরও অনেক কিছু আছে। এইদিন মা এই করেছিলেন, সেইদিন সেইটা হয়েছিল, আরেকদিন ওইখানে বেড়াতে গিয়েছিলাম — এইরকম একটা ক্রমধারায় জীবনী (chronological biography) লিখতে চাইছি না। এক ব্যক্তির আত্মিক, বৌদ্ধিক এবং মানসিক প্রতিমা, বৃহত্তর মানবজীবন এবং আবেগ–অনুভূতির কথা মাথায় রেখে, শব্দের মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

একটি সাধারণ ঘরের ভেতরে একটি বিছানায় মা তাঁর তিন সন্তানকে নিয়ে বসে আছেন। পেছনে জংধরা দেওয়াল আর জানালায় গ্রিল, পাশে কাঠের টেবিলে একটি ছোট সাদাকালো টেলিভিশন রাখা আছে।
আমার মা। মায়ের কোলে মাঝখানে আমি।
আমার বাঁ ও ডান পাশে রুপেন আর টুপাই। প্রতিবেশী বন্ধু। 
আনুমানিক ১৯৯০ সালের ছবি। আমার বয়স তখন ~৩ বছর।

কথায় বলে বেঁচে থাকা — শরীর ধারণ করাই — এক বিড়ম্বনা। এই আক্ষেপ অতি প্রাচীন, তবে, বর্তমান সময়েও এই উপলব্ধি একই রকম বা আগের থেকে অধিকভাবে প্রযোজ্য।

শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, প্রেম — এইসব পণ্যে পরিণত হয়েছিল অনেক আগে। এখন দিন দিন এই জিনিসগুলো ক্রমে নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। শৌখিন জিনিসের কথা আপাতত বলছিই না। বেঁচে থাকার একেবারে মৌলিক জিনিসগুলোও যেন দুষ্প্রাপ্য ও দুর্লভ। 

সাধ আর সাধ্যের মধ্যে ফারাক দিন দিন বেড়েই চলেছে। আমাদের মতো দেশে আপনি স্বাস্থ্য, শিক্ষা জাতীয় পরিষেবা পান না, আপনাকে টাকার জোরে কিনতে হয়। You don't avail of health and education facilities, you purchase them. 

জীবন যেন এক বোঝা — liability — পিঠের ওপর চেপে বসে আছে। আর এর ভার দিন দিন বেড়েই চলেছে।

বেঁচে থাকার অত্যাবশ্যকীয় জিনিসগুলোর নিরন্তর এবং মাত্রাতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণ, স্বাভাবিকভাবে, একটা সমাজে দুশ্চিন্তার বিষয় হওয়া উচিত। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এই দুশ্চিন্তার স্তর অনেককাল আগেই পেরিয়ে গেছে। 

এর সঙ্গে রয়েছে এক মারাত্মক সহানুভূতির অভাব। দ্বিতীয়, তৃতীয়, পঞ্চম অধ্যায়ে অনুভূতির অভাব সম্পর্কে কিছু কথা লিখেছিলাম। সার্বিকভাবে একটা অত্যন্ত বড়ো অসামঞ্জস্য আছে — একটা ভয়াবহ ঘৃণা এবং অবহেলার পরিবেশ। 

হিংসা, ঘৃণা, দুর্নীতি, জালিয়াতি, অহংপ্রদর্শনের লড়াই, একে অন্যের প্রতি অবজ্ঞা আর যা যা সমস্যা চোখে পড়ে, এইটা খুবই সম্ভব যে সেইগুলো আমাদের মনের মধ্যে থাকা সুপ্ত চেতনার এবং অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ। এইটা সম্ভব যে আসলে সকল আচরণ মানসিক স্তরে বা গভীরতর স্তরে রয়েছে। যেটা চোখে পড়ছে, এবং আমরা যাকে সমস্যা বলে চিহ্নিত করছি, সেইটা সামান্য বহিঃপ্রকাশ মাত্র। মূল সমস্যা অনেক গভীরে নিহিত। আর যদি এইটা সত্যি হয়ে থাকে, সমস্যাটা অনেক বেশি জটিল হয়ে যায়।

সাহির লুধিয়ানবী (১৯২১–১৯৮০) "তাজমহল" নামক একটি গজল রচনা করেছিলেন। এই গানটি ১৯৬৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত "গজল" চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত হয়। গানটি প্রেমের প্রতীক তাজমহলের উদ্দেশ্যে রচিত। 

হিন্দি: इक शहंशाह ने दौलत का सहारा ले कर
हम ग़रीबों की मोहब्बत का उड़ाया है मज़ाक़।
বাংলা লিপি: ইক শহনশাহ নে দৌলত কা সহারা লে কর
হম গরীবো কি মোহব্বত কা উড়ায়া থা মজাক।
বাংলা অনুবাদ: এক সম্রাট তাঁর ধনসম্পত্তির দম্ভে 
আমাদের মতো গরীবদের ভালোবাসার পরিহাস করেছিলেন।

গানটিতে এক বিরহ, এক যন্ত্রণা বারবার ফিরে আসে। আর সঙ্গে সঙ্গে গানের মধ্যে বারবার এক আকুতি ফুটে ওঠে— 

হিন্দি: मेरी महबूब कहीं और मिला कर मुझ से।
বাংলা লিপি: মেরি মহবুব কঁহি অউর মিলাকর মুঝসে।
অনুবাদ: আমার প্রিয়তম, তোমার সাথে অন্য কোথাও দেখা হবে।

আমার মা গত ২৭ অগাস্ট মারা গেছেন। আমার মনের মাঝে এক মারাত্মক অবসন্নতা অনুভব করছি। দুঃখ রয়েছে। তারই সঙ্গে এক অস্বস্তিও রয়েছে। আমার মা যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তাহলেই বা আজ এমন কী বিশাল ফারাক হতো? সেই তো একই ডাক্তার–ওষুধ–হাসপাতালের চড়া বিল, সেই তো একই চারিদিকে অনীহা–অবজ্ঞা। এমন তো নয়, মা বেঁচে থাকলেই আজ সবকিছু স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠতো। ভিতরে ভিতরে তো আরও বেশি ক্ষয়ে যেতেন। 

একজন হাসিখুশি মহিলা শাড়ি পরে ঘরের ভেতরে কোলে একটি ছোট শিশুকে ধরে আছেন। শিশুটি লাল পোশাক পরা এবং অন্যদিকে তাকিয়ে আছে, মা স্নেহভরে তার দিকে তাকিয়ে আছেন।
মায়ের কোলে আমি। 
১৯৮৮–এর শেষের দিকের ছবি। 
আমার বয়স তখন ১ বছর।

মনের মধ্যে একটা খুব অস্বস্তি–অনিশ্চয়তা অনুভব করছি। 

মা, তুমি নেই, আমি খুবই দুঃখিত। তোমাকে আমাকে ভালোবাসি। তবে, তোমার সাথে এইখানে নয় — এইখানে আর নয় — অন্য কোথাও দেখা হবে। 

মেরি মহবুব কঁহি অউর মিলাকর মুঝসে।

দ্রষ্টব্য: এই লেখাটি আপনি স্বপ্না দত্ত ওয়েবসাইটেও পড়তে পারেন।

স্বপ্না দত্ত, আমার মা (Swapna Dutta, my Mother)


This page was last updated on: 29 August 2025
Number of revisions on this page: 1
Internet Archive Backup: See here

Friday, August 22, 2025

স্বপ্না দত্ত, আমার মা: পঞ্চম অধ্যায়

একটা খামতি লক্ষ্য করি। একটা অভাব। সময়ের অভাব, সহানুভূতির অভাব, মনোযোগের অভাব, ভালোবাসার অভাব। 

যেন স্পষ্ট আমরা একে অপরকে বলে দিচ্ছি— "না হে বাপু, কোনও সময় নেই তোমার জন্য। তোমার আর আমার পথ আলাদা। তোমার আর আমার জীবন আলাদা। কোনও জায়গা নেই তোমার জন্য।"

যেন একে অপরের সাথে কথা বলছি শুধু তাঁর কাছ থেকে কতটা কী পাওয়া যায়, কত কিছু সুযোগ–সুবিধা আদায় করা যায়, তার জন্য। নেটওয়ার্কিং করতে হবে যে!

তাই আমরা একে অপরের রূপ–রস–গন্ধ, যোগ্যতা–ক্ষমতা–বুদ্ধিমত্তা দাঁড়িপাল্লা দিয়ে মাপছি। ওহ, তোমার এত ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স! বাপ রে, তোমার এত বড় বড় মানুষের সাথে পরিচয়! বাহ, তুমি কি সুন্দরী! — ক্রমাগত মেপেই চলেছি।

গোদের ওপর বিষফোঁড়া হয়ে রয়েছে ছদ্ম মতাদর্শ আর বিশ্বাস। এ মা, তুমি বাঁ হাতি, আমি তো ডান হাতি। তুমি আওয়ামী লীগের সমর্থক, আমি ছাত্র আন্দোলন যে। তুমি সকালে ধোসা খাও, আমি ইডলি। এইরকম খুঁজে খুঁজে এক–আধটা ফারাক পাওয়া গেলেই — সোজা বলে দেওয়া যেতে পারে— "এইবার তুমি ভাগো"।

শুধু এতেই শেষ হলে হতো। যেই একটু ফারাক পাওয়া গেল সমালোচনা–তিরস্কার, ব্যঙ্গ–বিদ্রূপ শুরু। কারণ থাকলে তো বটেই, কারণ না থাকলেও কোনও ছাড় নেই — এবং সেটা চলতেই থাকবে। 

মানুষ হিসাবে আমাদের প্রধান কাজ যেন অন্যের ভুল ধরা, অন্যের সমালোচনা করা আর অন্যকে অপমানিত–আহত করা। 

সহানুভূতি নেই। ভালোবাসা তো একদমই নেই।

স্বপ্না দত্ত নামের একজন মহিলা একটি ভেজা ফুটপাতের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি একটি উজ্জ্বল হলুদ শাড়ি পরে আছেন এবং মুখে একটি মাস্ক পরা রয়েছে। পেছনে, একটি বিশাল, কারুকার্যখচিত ভবন দেখা যাচ্ছে যেখানে গম্বুজ, স্তম্ভ এবং খিলান রয়েছে, যা বেঙ্গালুরুর বিধান সৌধ। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। একটি ব্যস্ত রাস্তা, যেখানে একটি গাড়ি এবং একটি তিন চাকার অটোরিকশাসহ কিছু গাড়ি ঝাপসাভাবে দেখা যাচ্ছে, মহিলাটিকে ভবন থেকে পৃথক করেছে। দৃশ্যটি দেখে মনে হচ্ছে সম্প্রতি বৃষ্টি হয়েছে, কারণ রাস্তা এবং ফুটপাত ভেজা।
আমার মা — বিধান সৌধ, ব্যাঙ্গালোরের সামনে।
১৪ জুলাই ২০২১।

সময়ের অভাব

সময় নেই। তোমার কথা শোনার সময় নেই। তোমার অনুভূতি বোঝার সময় নেই। তোমার সাথে বা তোমার পাশে থাকার সময় নেই। অথচ পরিস্থিতির কিছু না জেনে, না বুঝে বাজে মন্তব্য করে দেওয়ার যথেষ্ট সময় আছে। এই ধরনের আলপটকা সব মন্তব্যের সারাংশই এক— "আমি জানি, তুমি জানো না। আমি ঠিক, তুমি ভুল।" 

সময় নেই। এই এক ঘণ্টা পরে আমার ভিডিও কল আছে। আগামী পরশু কনফারেন্স অ্যাটেন্ড করতে যেতে হবে যে। উইকএন্ডে পার্টি আছে। ফেসবুক গ্রুপে গিয়ে ডিবেট করতে হবে। ইন্সটাগ্রামে রিল দেখতে হবে — অতএব, তোমার জন্য সময় নেই। 

কিছু একটা ত্রুটি–বিচ্যুতি পেলেই, বা না পেলেও, তোমার জন্য আর সময় নেই।

মেসেজ ইগনোর করে দেব। ব্লক করে দেব। কোনও উত্তর বা পাত্তা দেব না। ... যতক্ষণ না আমার নিজের কোনও কিছু দরকার লাগছে।

সহানুভূতির অভাব

সহানুভূতি — অন্যের অনুভূতি নিজের অনুভূতির মতো অনুভব করা। নেই — সহ অনুভূতি নেই। অনুভূতি যেন সম্পূর্ণ অন্য গোলার্ধে অবস্থান করছে। দাবায় তুমি সাদা হলে আমি কালো। এইরকম বোধ এবং অনুভূতিহীনতা নিয়েই চলছে। 

মনোযোগের অভাব

মনোযোগ–টনোযোগ দিতে পারবো না বাপু। তোমার কাজে, তোমার ব্যাপারে মনোযোগ দেওয়ার — তোমার কথা মন দিয়ে শোনার ইচ্ছে বা সময় কোনটাই আমার নেই। মনোযোগের আশা একদম করো না। 

ভালোবাসার অভাব

ভালোবাসা? সে তো অলীক। তুমি আবার ভালোবাসাও চাও? দাবী তো তোমার কম নয়! তোমার কাছে কুঁড়েঘর নেই, তুমি প্রাসাদে থাকার স্বপ্ন দেখছো! তোমার কাছে শুকনো রুটি নেই, তুমি রুপোর থালায় সোনার চামচ করে শাহী খাবার খেতে চাইছো। 

ভালোবাসা ছিল না — নেই — থাকবেও না। ভালোবাসার কথা তুমি তুললেই বা কী মনে করে? এই বিষয়ে আর কথা বাড়াতে চাইছি না। ভালোবাসা নেই।

(হয়তো) আপনার প্রশ্ন

হয়তো আপনি এখন একটা প্রশ্ন করার কথা ভাবছেন—

এই যে তুমি এইটা নেই, সেইটা নেই বলে যাচ্ছ, তুমি নিজে কী করছো? তুমি সারা পৃথিবীকে যেন কাঠগড়ায় তুলে দিচ্ছ। তুমি নিজে কাকে কী দাও বাপু?

আপনার এই প্রশ্নেরই অপেক্ষায় ছিলাম। এত দেরি করলেন যে এই প্রশ্নটা করতে!

এখন আপনি আমাকে এই প্রশ্ন করছেন। কী জানেন? আপনি যদি আমাকে এই একই কথাগুলো বলতেন যে সহানুভূতি নেই, ভালোবাসা নেই, ইত্যাদি, আমিও আপনাকে থামানোর জন্য, বোধ করি, একই প্রশ্ন করতাম "আরে মশাই, আপনি নিজে কী করছেন? কাকে কী দিচ্ছেন?" এইটা দারুণ মজার ব্যাপার, তাই না?

আরেকটা জিনিস লক্ষ্য করুন। এই লেখায় এই অবধি কে কাকে এই আক্ষেপ — এই প্রশ্নগুলো করছে, তা স্পষ্ট করে উল্লেখ করিনি। আমি জানি এই অভাবগুলো কোনো একক ব্যক্তির নয়। আমি জানি আপনিও কখনও কখনও বা হামেশাই এই অভাবগুলো অনুভব করে থাকেন। অতএব, "তুমি নিজে কী করছো?" জাতীয় প্রশ্ন করে দয়া করে আপনি নিজেই নিজের কণ্ঠরোধ করবেন না। 

আমার মা — স্বপ্না দত্ত 

ছবিটিতে স্বপ্না দত্ত নামের একজন মহিলাকে একটি প্রশস্ত, ভেজা বালির সৈকতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। তিনি সামনের দিকে, ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি একটি সাদা এবং সোনালী শাড়ি পরে আছেন। পেছনে একটি ব্যস্ত সৈকতের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। সেখানে অসংখ্য অস্থায়ী দোকান এবং ছোট ছোট ঝুপড়ি রয়েছে, যেগুলিতে রঙিন শামিয়ানা লাগানো আছে, যা একটি বাজার বা বিক্রেতা এলাকার ইঙ্গিত দেয়। মানুষজন এই দোকানগুলির আশেপাশে হাঁটাহাঁটি করছে এবং জড়ো হচ্ছে। ছবির বাম দিকে আরও পেছনে, এক সারিতে গাছ এবং কিছু পাথরের স্তূপ দেখা যাচ্ছে। আকাশ পরিষ্কার এবং রৌদ্রোজ্জ্বল মনে হচ্ছে, এবং সামগ্রিক দৃশ্যটি একটি জনাকীর্ণ, প্রাণবন্ত সৈকতের পরিবেশের।
আমার মা ওড়িশা–পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তে উদয়পুর সমুদ্রসৈকতে।
  ৫ নভেম্বর ২০২১।

একবার ভাবছিলাম ওপরের প্রতিটা অনুচ্ছেদ আরও কিছুটা করে লিখি। উদ্ধৃতি, বিবরণ, উদাহরণ দিয়ে আরও কিছুটা বড় করে লিখি। থাক, দরকার নেই। আমি জানি, আপনি আপনার নিজের মতো করে — নিজের অভিজ্ঞতা থেকে প্রতিটা অংশই আরও অনেকটা ভেবে নিতে পারবেন।

এইবার বলি আমার মায়ের কথা। এই যে নানা অভাবের কথা (সময়ের অভাব, সহানুভূতির অভাব, মনোযোগের অভাব, ভালোবাসার অভাব) বললাম আমিও প্রচণ্ড রকম এই সকল অভাব বোধ করি। আগেও খুব অভাব বোধ করতাম। এখন যেন আরও বেশি বেশি অভাব বোধ করছি। 

গত ২৭ জুলাই ২০২৫, রবিবার, আমার মা স্বপ্না দত্ত মারা গেছেন। আজকে মায়ের মৃত্যুর পর ২৫ দিন পার হলো। আজকে যখন ফেলে আসা দিনগুলোর দিকে ফিরে তাকাই, লক্ষ্য করি — বুঝতে পারি — আমার প্রতি আমার মায়ের ব্যবহারে এই একটা অভাবও ছিল না। না ছিল সময়ের অভাব। না মায়ের ছিল সহানুভূতি বা মনোযোগের অভাব। ভালোবাসার অভাবও ছিল না।

সমস্যা হচ্ছে, আমার মা মারা গেছেন। ফলে, আমার যে একটাই সম্পর্ক ছিল, যাঁর তরফ থেকে আন্তরিকতার অভাব ছিল না — সেইটাও গেছে। 

আচ্ছা, অহেতুক নাকে–কান্না কাঁদবো না। কিন্তু, এই পুরো বিষয়টাই আমার মনে হয়তো খুব বেশি চাপ ফেলে চলেছে।

ব্যাস, এই অবধি। পঞ্চম অধ্যায় এইখানেই শেষ করলাম। 

এই শব্দটা আজ লিখতে ইচ্ছে করছে না, জোর করেই লিখছি — চরৈবেতি।

দ্রষ্টব্য: এই লেখাটি আপনি স্বপ্না দত্ত ওয়েবসাইটেও পড়তে পারেন।

স্বপ্না দত্ত, আমার মা (Swapna Dutta, my Mother)


This page was last updated on: 22 August 2025
Number of revisions on this page: 1
Internet Archive Backup: See here

Friday, August 15, 2025

স্বপ্না দত্ত, আমার মা: চতুর্থ অধ্যায়, তৃতীয় পরিচ্ছেদ

আমার মায়ের শ্রাদ্ধের কাজ গত বৃহস্পতিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৫ (২২ শ্রাবণ ১৪৩২) তারিখে সম্পন্ন হয়েছে। চান্দ্রমাস অনুযায়ী, এইদিন দুপুর ১:২৮ অবধি শুক্ল চতুর্দশী তিথি ছিল, এবং ১:২৯ থেকে পূর্ণিমা শুরু হয়। সেই হিসাবে আমার মায়ের শ্রাদ্ধের প্রথম অংশ শুক্ল চতুর্দশী তিথিতে এবং অন্য অংশ পূর্ণিমা তিথিতে হয়েছে।

চতুর্থ অধ্যায়ের প্রথম ও দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে যথাক্রমে "শ্রাদ্ধ ও শ্রদ্ধা" এবং "ঘাটকাজ" বিষয়ে লিখেছিলাম। এই অধ্যায়ের তৃতীয় পরিচ্ছেদে শ্রাদ্ধদিবস বিষয়ে লিখছি।

বিবেকনগর কালীমন্দির

বিবেকনগর কালীমন্দিরে মায়ের শ্রাদ্ধের কাজ সংগঠিত হয়। যাদবপুর অঞ্চলে এইটি একটি বিখ্যাত মন্দির। মূলতঃ এইটি একটি কালীমন্দির ছিল। সেইজন্য এই মন্দিরটি বিবেকনগর কালীমন্দির বা কালীবাড়ী নামে পরিচিত। যদিও বর্তমানে এই মন্দির অভ্যন্তরে অন্যান্য দেবদেবীর প্রতিমাও রয়েছে। তাই মন্দিরটিকে "বিবেকনগর দেবালয়"–ও বলা হয়, এবং এই নামটিই মন্দিরের আনুষ্ঠানিক নাম। মন্দিরের প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৫০ সালে (১৩৫৭ বঙ্গাব্দে)। সোসাইটি হিসাবে রেজিস্ট্রেশন নম্বর: S/9228।

এখানে বিবেকনগর দেবালয় বা কালী মন্দিরের একটি ছবি রয়েছে। এটি একটি গোলাপি রঙের দোতলা ভবন, যার ছাদ সবুজ রঙের। ভবনের গায়ে বড় বড় জানালা রয়েছে, যেগুলির উপরের দিকে অর্ধবৃত্তাকার আর্চ বা ধনুকাকৃতি নকশা করা। নিচের তলায় লোহার জাল দিয়ে ঘেরা একটি বারান্দা দেখা যাচ্ছে। সামনে একটি খোলা জায়গা রয়েছে, যেখানে কয়েকটি সাইকেল রাখা আছে। ছবিটির বাম দিকে গাছের ডাল দেখা যাচ্ছে এবং ডান দিকে মন্দিরের চূড়া দেখা যাচ্ছে।
বিবেকনগর কালীমন্দির বা বিবেকনগর দেবালয়। 

এখানে বিবেকনগর কালীমন্দিরের ভেতরে কালীপ্রতিমার একটি ছবি রয়েছে। প্রতিমাটি একটি মন্দিরের মতো কাঠামোর ভেতরে স্থাপন করা হয়েছে, যার চারপাশে সাদা মার্বেল পাথরে লেখা অনেক ফলক দেখা যাচ্ছে। মেঝেতেও সাদা মার্বেলের ফলক পাতা আছে। প্রতিমাটি লাল বস্ত্র পরিহিত, এবং তার পেছনে একটি সূর্যসদৃশ চক্রের নকশা রয়েছে। ডান এবং বাম দিকে দুটি জানালা দেখা যাচ্ছে, যার একটি কাঠের এবং অন্যটি লোহার গ্রিলের। মন্দিরের প্রবেশপথটি সুন্দর নকশা করা কাঠামোর মাঝখানে অবস্থিত। ছবির উপরের ডানদিকে একটি হলুদ রঙের সাইনবোর্ডে কিছু লেখা দেখা যাচ্ছে।
মন্দিরে কালীপ্রতিমা

এখানে বিবেকনগর মন্দিরের রাধাকৃষ্ণ প্রতিমার একটি ছবি দেখা যাচ্ছে। একটি মন্দিরের মধ্যে রাধা ও কৃষ্ণের প্রতিমা রাখা আছে। মন্দিরের সামনে দুটি হলুদ দড়িতে ঝোলানো একটি দোলনা রয়েছে, যা লাল কাপড়ে সাজানো। দোলনার উপর একটি ফ্রেমে রাধা ও কৃষ্ণের ছবিও রাখা আছে। ছবির উপরের দেওয়ালে
 রাধাকৃষ্ণ প্রতিমা

বিবেকনগর কালীমন্দিরে অনির্বাণ ভদ্র (টুকাই)-এর স্মৃতিফলক। জন্ম: ৭ অক্টোবর ১৯৮৩, মৃত্যু: ২৫ জুন ২০০৭, তারিখসহ স্থান ও প্রার্থনার কথাসহ লেখা। স্মৃতিফলকে তাঁর বিদায় এবং তাঁর মায়ের শোক ও প্রার্থনা বর্ণিত। মন্দিরের দেওয়ালে লাল ও সাদা পটভূমিতে কালো অক্ষরে বাংলায় লেখা।
মন্দিরের অভ্যন্তরে দেওয়ালে ও মেঝেতে অনেক স্মৃতিফলক রয়েছে। 
 বহু মানুষের — বহু জীবনের স্মৃতি বহন করছে এই ফলকগুলি।

শ্রাদ্ধের স্থান

শ্রাদ্ধের জন্য আমরা কালীমন্দিরের দোতলা সেইদিন ভাড়া নিয়েছিলাম। দুইখানা মাঝারি আকারের ঘর, সংযোগকারী বারান্দা, একটা ঘর কিচেন হিসাবে ব্যবহারের জন্য, এবং টয়লেট। আমার মামা শ্রী শুভব্রত ভট্টাচার্য্য শ্রাদ্ধের দুই দিন আগে এই স্থানের একটা ভিডিও তুলেছিলেন। সেইটি নীচে দিচ্ছি, ব্যাকগ্রাউণ্ডে বাংলায় ওনার কণ্ঠস্বর। 

বিবেকনগর মন্দিরের দোতলা।
এইখানে মায়ের শ্রাদ্ধের কাজ করা হয়েছে।

শ্রদ্ধা নিবেদন

সকাল ১০:৪০ নাগাদ পুরোহিত শ্রী পাপন চক্রবর্তীর তত্ত্বাবধানে শ্রাদ্ধের কাজ শুরু হয়। অনুষ্ঠানের শুরুর সময় আমার মামা শুভব্রত ভট্টাচার্য্য এবং আমি ছিলাম। পুরোহিতের নির্দেশে আমি শাস্ত্রানুসারে শ্রদ্ধানিবেদন, মন্ত্রোচ্চারণ, এবং প্রার্থনা শুরু করি।

প্রণাম

শ্রাদ্ধের অনুষ্ঠানে শ্রীবিষ্ণুকে পুনঃপুনঃ প্রণাম জানানো হয়। প্রধান মন্ত্র হলো—

সংস্কৃত: ॐ नमो भगवते वासुदेवाय।
বাংলা: ॐ নমঃ ভগবতে বাসুদেবায়।
অনুবাদ:  ভগবান বাসুদেবকে (বিষ্ণু/কৃষ্ণ) প্রণাম জানাই।

বিষ্ণুকে প্রণাম জানানোর পর সকল দেবদেবীকে প্রণাম জানানো হয়। শিবপ্রণাম, গঙ্গা–যমুনা–সরস্বতী নদীকে প্রণাম, যমকে প্রণাম ইত্যাদি। এই ছাড়াও এই প্রণাম অংশে পিতৃপুরুষাভ্য (পূর্বপুরুষদের), আর সত্যদ্রষ্টা ঋষিদের প্রতি প্রণাম জানানো হয়। এই প্রণাম অংশটি বেশ বিস্তৃত।

প্রায়শ্চিত্ত

প্রায়শ্চিত্ত শ্রাদ্ধ কাজের একটি প্রাথমিক অংশ। প্রায়শ্চিত্তে মন্ত্রোচ্চারণ এবং সংকল্পের মাধ্যমে অশৌচকালে হয়ে থাকা ভুল–ত্রুটি, মনোযোগহীনতা, শাস্ত্রবিধি পরিপন্থী কাজ যদি কিছু হয়ে থাকে, সেই সকলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা ও অনুশোচনা করা হয়। 

ষোড়শ দান

শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় বড় পর্যায় হলো দান। যদি ষোড়শ দান করা হয় তাহলে যেই ষোলোটি জিনিস উৎসর্গ করা হয়, সেইগুলি হলো— 

  1. অন্ন (চাল বা প্রধান খাদ্যসামগ্রী, সাথে পাঁচরকম মিষ্টি),
  2. উত্তরীয় যেমন শাল,
  3. কলস বা জলসহ জলাধার, 
  4. বস্ত্র (শাড়ি বা ধুতি),
  5. প্রদীপ, 
  6. শাকসবজি ও রন্ধন উপকরণ  —  বিভিন্ন মশলা, নুন, সর্ষের তেল,
  7. স্বর্ণ (প্রতীকী হিসাবে টাকা দেওয়া হতে পারে),
  8. রৌপ্য (প্রতীকী হিসাবে টাকা দেওয়া হতে পারে),
  9. ভূমি (প্রতীকী হিসাবে টাকা দেওয়া হতে পারে),
  10. জুতো বা চটি,
  11. তাম্বুল,
  12. ছত্র বা ছাতা,
  13. সুগন্ধী (চন্দনকাঠ ইত্যাদি)
  14. মালা বা পুষ্পস্তবক (সাদা ফুল যেমন রজনীগন্ধা)
  15. ফল (বিভিন্ন রকম ফল, অধিকাংশ ক্ষেত্রে বলা হয় প্রয়াত ব্যক্তির প্রিয় পাঁচরকম ফল একটি করে),
  16. শয্যা বা বিছানা। 

ষোড়শদানের সামগ্রী বিভিন্ন সম্প্রদায়, মতবাদ, এবং অনুষ্ঠানপদ্ধতিতে সামান্য ভিন্ন হতে পারে। ষোড়শদান শুধুমাত্র ষোলোটি বস্তু বা সামগ্রীর দান নয়, বরং এই দানগুলির সবকটিই দৈনন্দিন জীবনে আবশ্যক এবং একই সঙ্গে প্রতীকী। এই দান প্রয়াত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়, যাতে তাঁর পারলৌকিক জীবন বা যাত্রাপথে কোনও অভাব না থাকে। একটু অন্যভাবে দেখলে মা অথবা বাবা একটা সময়ে তাঁর সন্তানের জন্য অন্ন, বস্ত্র ইত্যাদি জোগাড় করেছিলেন। এখন তাঁর মৃত্যুর পর সন্তান চেষ্টা করছে যাতে মায়ের অথবা বাবার পারলৌকিক জীবনে অভাব না হয়। 

এই সকল জিনিসের ব্যবহারিক গুরুত্ব — যাঁর উদ্দেশ্যে এইসকল সামগ্রী দেওয়া হচ্ছে তিনি কীভাবে ব্যবহার করবেন, তা আমার জানা নেই। তবে আত্মিক বা মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে এই প্রয়াস খুব অর্থপূর্ণ ও মর্মস্পর্শী বোধ করি।

একটি শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানের জন্য ষোড়শ দানের সামগ্রী সাজানো রয়েছে। একটি শয্যার উপর ধুতি, শাল, চাল, ফল, সবজি (বেগুন, শসা), তিল, ডাল, গুড়, লবণ, তেল, দই এবং মধুর মতো বিভিন্ন জিনিস রাখা আছে। মাঝখানে একটি পিতলের কলস, পিতলের বাটি, একটি দেওয়াল ঘড়ি এবং একটি ছবি দেখা যাচ্ছে।
আমার মায়ের জন্য ষোড়শ দান।

সকল শ্রাদ্ধে যে ষোড়শদানই করতে হবে এমন নয়। অন্যান্য প্রকারের দানও রয়েছে। যেমন— 

  1. ত্রিদান (অন্ন, বস্ত্র, জল), 
  2. চতুর্দান (অন্ন, বস্ত্র, জল, ফল), 
  3. রাজকীয় দান বা রাজদান (গরু, সোনা, রূপো, ভূখণ্ড ইত্যাদি, সাথে ষোড়শদানের সামগ্রী),

আমার মায়ের শ্রাদ্ধে আমি ষোড়শদান করেছি।

পিণ্ডদান

শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানের তৃতীয় অংশ হলো পিণ্ডদান। আতপ চাল, তিল, কলা, এবং মিষ্টি (সন্দেশ) দিয়ে গোলাকার পিণ্ড প্রস্তুত করা হয়। পিণ্ডগুলি মৃত ব্যক্তির আত্মার আহার্যের উদ্দেশ্যে নিবেদন করা হয় যাতে সেইগুলি তাঁর পারলৌকিক যাত্রায় তাঁকে শক্তিপ্রদান করতে পারে। পিণ্ডদান মূলতঃ তিন পুরুষের উদ্দেশ্যে করা হয়— প্রয়াত ব্যক্তি, তাঁর মাতা/পিতা এবং পিতামহী/পিতামহ। এইছাড়া, পিণ্ডদানের শুরুতে যদি বংশের কারও অপঘাতে (যেমন অগ্নিদগ্ধ বা আগুণে পুড়ে) মৃত্যু হয়ে থাকে বা পূর্বপুরুষদের মধ্যে কারও শ্রাদ্ধ কোনও কারণে না হয়ে থাকে, তাঁদের আত্মার শান্তি প্রার্থনা করা হয়। 

পিণ্ডদানের সময় বিভিন্ন মন্ত্র পাঠ করা হয়, যা পূর্বপুরুষের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধানিবেদন এবং তাঁদের আত্মার শান্তি কামনার সঙ্গে সংযুক্ত। পিণ্ডদান বংশের ধারাবাহিকতা এবং প্রজন্মের বন্ধনকে নির্দেশ করে।

পিণ্ডদান পর্বে পিণ্ডনির্মাণের কাজ করছি।

গীতাপাঠ

আমার মায়ের শ্রাদ্ধের দিন মূল শ্রদ্ধানিবেদনের পাশাপাশি গীতাপাঠের আয়োজন করেছিলাম। বিবেকনগর কালীমন্দিরের পুরোহিত শ্রী অভিজিৎ মুখোপাধ্যায় শ্রাদ্ধ চলাকালীন সমান্তরালভাবে শ্রীমদ্ভাগবদ্গীতা পাঠ করছিলেন।

শ্রী অভিজিৎ মুখোপাধ্যায় গীতাপাঠ করছেন।

আত্মীয় পরিজনের শ্রদ্ধানিবেদন

শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান চলাকালীন আত্মীয় পরিজন এবং পরিচিত ব্যক্তিরা মায়ের ছবিতে মাল্যদান করে মাকে স্মরণ করেন ও তাঁর প্রতি শ্রদ্ধানিবেদন করেন। 

আমার মা স্বপ্না দত্তের শ্রাদ্ধের দিনে তাঁর ছবির উপর আত্মীয়-পরিজনদের শ্রদ্ধা নিবেদনের দৃশ্য। ছবিতে সাদা রজনীগন্ধা ফুলের একটি বিশাল মালার মধ্যে মায়ের দুটি ছবি রাখা হয়েছে। মালার পাশে আরও একটি রজনীগন্ধা ফুলের তোড়া এবং একটি মাটির পাত্র (ভাঁড়) দেখা যাচ্ছে, যা শ্রদ্ধার্ঘ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
মায়ের স্মৃতির উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধানিবেদন।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ইমন ভট্টাচার্য্য, আমার মামাতো বোন, যিনি মূল শ্রাদ্ধপর্বে অংশ নিয়ে মায়ের প্রতি শ্রদ্ধানিবেদন ও তাঁর আত্মার শান্তি প্রার্থনা করেন। 

ইমন ভট্টাচার্য্য আমার মায়ের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করছেন।
সমান্তরালভাবে গীতাপাঠ চলছে।

শ্রাদ্ধের মূল কাজ এবং মন্ত্র পাঠের পর উপস্থিত আত্মীয়–পরিজন এবং শুভানুধ্যায়ীদের জন্য আহারের ব্যবস্থা করা হয়। মায়ের শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে পুরোহিত এবং ক্যাটারিং–এর কর্মীগণ বাদে মোট ৭২ জন উপস্থিত ছিলেন। এই কঠিন সময়ে তাঁদের উপস্থিতি আমাদের জন্য এক মানসিক সহায় ছিল। একত্রিত হয়ে মায়ের আত্মার শান্তি কামনার মধ্য দিয়ে শ্রাদ্ধের সম্পূর্ণতা লাভ করে। 

মা স্বপ্না দত্তের শ্রাদ্ধের দিনে আত্মীয় ও পরিচিতজনদের জন্য দুপুরের আহারের ছবি, যেখানে সকলে একসাথে বসে খাবার খাচ্ছেন।
শ্রাদ্ধের শেষে শুভানুধ্যায়ীদের দুপুরের আহার।

ছবিতে চারজন ব্যক্তি একটি কক্ষে চেয়ারে বসে আছেন। বামদিকের প্রথম ব্যক্তি ধুতি এবং সাদা গেঞ্জি এবং ব্যাগ হাতে বসেছেন। বাকি তিনজন পরিধান করেছেন শার্ট-প্যান্ট। কারও পায়ে জুতো বা চটি নেই। কক্ষটি সবুজ দেয়াল এবং লাল মেঝে সহ, পেছনে আরও কিছু ব্যক্তি এবং খোলা জানালা দেখা যাচ্ছে।
ছবির ডানদিক থেকে বামদিকে রয়েছেন—
 শ্রী বাপি দাস, শ্রী নীলম পণ্ডা, শ্রী অর্ক মালিক, এবং আমি।

উপসংহার 

বুকের মধ্যে এক অবসন্নতা বোধ করছি ... একটা ভোঁতা অনুভূতি।

চতুর্থ অধ্যায়, তৃতীয় পরিচ্ছেদ — শ্রাদ্ধদিবস — এইখানেই শেষ করলাম।

চরৈবেতি।

দ্রষ্টব্য: এই লেখাটি আপনি স্বপ্না দত্ত ওয়েবসাইটেও পড়তে পারেন।

স্বপ্না দত্ত, আমার মা (Swapna Dutta, my Mother)


This page was last updated on: 20 August 2025
Number of revisions on this page: 2
Internet Archive Backup: See here

Tuesday, August 12, 2025

স্বপ্না দত্ত, আমার মা: চতুর্থ অধ্যায়, দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

ঘাটকাজ কোনও ব্যক্তির শ্রাদ্ধকাজ বা তাঁর প্রতি শ্রদ্ধানিবেদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সাধারণত, আদ্যশ্রাদ্ধ (ব্যক্তির মৃত্যুর পর অশৌচান্তে প্রথমবার শ্রাদ্ধ) করার ঠিক পূর্বে ঘাটকাজ করা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শ্রাদ্ধের আগের দিন, আর কিছু ক্ষেত্রে শ্রাদ্ধের দিনই খুব ভোরে এই কাজ করা হয়। তবে যেই হেতু শ্রাদ্ধের দিনে খুব ব্যস্ততা থাকে তাই শ্রাদ্ধের আগের দিনই ঘাটকাজ করা অধিক প্রচলিত এবং শাস্ত্রসম্মত। ঘাটকাজ আদ্যশ্রাদ্ধের প্রথম অংশ এবং এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই আদ্যশ্রাদ্ধের সূচনা হয়।

আমার মায়ের জন্য ঘাটকাজ গত বৃহস্পতিবার, ৭ অগাস্ট ২০২৫ (২১ শ্রাবণ ১৪৩২) সম্পন্ন হয়েছে।

সম্পূর্ণ দৈর্ঘ্যের একটি ছবিতে একজন মহিলা, যিনি একটি হলুদ ও সবুজ শাড়ির উপর একটি লাল সোয়েটার এবং একটি সবুজ স্কার্ফ পরে আছেন। তিনি সামনের দিকে দাঁড়িয়ে, ক্যামেরার দিকে মুখ করে হালকা হাসছেন। তাঁর পিছনে একটি বড়, কারুকার্যময়, সোনালী রঙের গেট রয়েছে যার উপরে "SRI SRI MATRI MANDIR" লেখা আছে। খোলা গেট দিয়ে একটি গোলাপি রঙের বাড়ি ও একটি বড় গাছ সহ একটি উঠোন দেখা যাচ্ছে। গেটের ডান দিকে একটি লাল রঙের সাইনবোর্ড ঝুলছে।
আমার মা — জয়রামবাটীতে মাতৃমন্দিরের সামনে।
১৩ জানুয়ারি ২০২০ তারিখে তোলা ছবি। 
১৮৫৩ সালে এই জয়রামবাটী গ্রামে রামকৃষ্ণদেবের সহধর্মিণী সারদা মায়ের জন্ম হয়েছিল।

ঘাটকাজ — নাম ও স্থান

নদী বা পুকুরের ঘাটে করা হয় বলে এই প্রক্রিয়ার নাম ঘাটকাজ। 

মানুষের সভ্যতা নদীমাতৃক। হাজার হাজার বছর ধরে নদীকে ঘিরে — নদীর তীরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য জনপদ। কখনও গঙ্গা, কখনও কাবেরী, তিতাস — মহানন্দা — গাঙুড়। কখনও মিসিসিপি, টাইগ্রিস–ইউফ্রেটিস, হলুদ নদী হোয়াং হো, বা প্রশস্ত ভোলগা। মানুষ নিজের ব্যক্তিগত, সামষ্টিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনকে মিলিয়ে দিয়েছে নদীর প্রবাহের সাথে।

নদীর সাথে মানুষের এই একাত্মতা এবং নিবিড় সম্পর্কের কারণে কোনও অঞ্চলের প্রধান নদীর তীরেই ঘাটকাজ করা বিধেয়। নদীর অভাবে পুকুর, দিঘী, বা কোনও বড় এবং পরিষ্কার জলাশয়ের পাড়ে ঘাটকাজ করা যেতে পারে। 

ঘাটকাজকে আরও কয়েকটি নামে অভিহিত করা হয়—

  1. ঘাটশ্রাদ্ধ: নদী বা পুকুরঘাটে এই শ্রাদ্ধ করা হয় বলে এই অনুষ্ঠানকে ঘাটশ্রাদ্ধ বলা হয়।
  2. ঘাটপিণ্ডদান: পিণ্ডদানের মূল স্থান ঘাট হওয়ায় একে ঘাটপিণ্ডদান বলা হয়।
  3. পূরক পিণ্ডদান: পূরক পিণ্ড অর্থ যে পিণ্ডদান করা হয় সেইটা মৃত ব্যক্তির আহার হিসাবে নয়, বরং মৃত ব্যক্তির পারলৌকিক দেহ গঠনের উদ্দেশ্যে। 
  4. জলশ্রাদ্ধ: জলের সংস্পর্শে শ্রাদ্ধকার্য সম্পন্ন হওয়ার কারণে একে জলশ্রাদ্ধও বলা হয়।
  5. তর্পণ–সহ শ্রাদ্ধ: ঘাটে পিণ্ডদানের পাশাপাশি তিলতর্পণও করা হয়। পুরোহিতেরা একে তর্পণ–সহ শ্রাদ্ধ বলে থাকেন।
  6. অশৌচমোচন শ্রাদ্ধ: ঘাটকাজের মাধ্যমেই অশৌচকাল সমাপ্ত হয় বলে একে অশৌচমোচন শ্রাদ্ধ বলা হয়। যদিও এইখানে স্পষ্টতই আচরণের বিভিন্নতা রয়েছে। অনেকে ঘাটকাজের দিনকেই অশৌচমোচন হিসাবে চিহ্নিত করেন। আবার অনেকে পরের দিন অর্থাৎ শ্রাদ্ধের দিন বা শ্রাদ্ধের এক বা দুই দিন পরে নিয়মভঙ্গের দিন অবধি অশৌচ এবং নিয়ম পালন করেন।
বিবেকনগর ঝিলের উত্তরদিকের ঘাটের একটি দৃশ্য, যেখানে জল স্থির এবং আকাশের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। ঝিলের পাড়ের ডান দিকে একটি আচ্ছাদিত কাঠামো এবং একটি নীল রঙের জলাধার দেখা যাচ্ছে। ঝিলের পাড়ে গাছপালা এবং দূরে কিছু আবাসিক ভবন দৃশ্যমান। আবহাওয়া মেঘমুক্ত, কিন্তু আকাশ কিছুটা ধূসর।
বিবেকনগর ঝিলের উত্তরদিকের ঘাট থেকে তোলা ছবি।
এই ঘাটেই মায়ের ঘাটশ্রাদ্ধ হয়।

পূরক পিণ্ড

ঘাটকাজের দিন পূরক পিণ্ডদান করা হয়। মৃত ব্যক্তির পঞ্চভূতনির্মিত দেহ সৎকার বা দাহের মাধ্যমে প্রকৃতির সাথে মিশে গিয়েছিল। এখন ব্যক্তির মৃত্যুপরবর্তী সুদীর্ঘ যাত্রার জন্য সূক্ষ্ম দেহ নির্মাণ উদ্দেশ্যে পিণ্ডদান করা হয়। 

ব্যক্তির মৃত্যুর পর অশৌচকালের প্রথম দশদিনে যে পিণ্ড অর্পণ করা সেই দশটি হলো পূরক পিণ্ড। ঘাটকাজের দিন এই দশদিনের পিণ্ড পুনর্নির্মাণ করে উৎসর্গ করা হয়। 

ঘাটকাজের দিন সাধারণত এগারোটি পিণ্ড উৎসর্গ করা হয়। দশটি পিণ্ড মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে, আর একটি যমের বাহন কাকের উদ্দেশ্যে, যে মৃত্যুর পরবর্তী যাত্রায় সহযাত্রী ও সহায়ক হয়। এই দশটি পিণ্ড দিয়ে ব্যক্তির সূক্ষ্মদেহের ভিন্ন অংশ নির্মিত হয়।

  1. প্রথম পিণ্ড: মাথা
  2. দ্বিতীয় পিণ্ড: কাঁধ ও হাত
  3. তৃতীয় পিণ্ড: বুক ও গলা
  4. চতুর্থ পিণ্ড: পিঠ
  5. পঞ্চম পিণ্ড: নাভি ও পেট
  6. ষষ্ঠ পিণ্ড: কোমর
  7. সপ্তম পিণ্ড: নিতম্ব ও জননতন্ত্র
  8. অষ্টম পিণ্ড: উরু
  9. নবম পিণ্ড: হাঁটু
  10. দশম পিণ্ড: পা

এইখানে আপনি জিজ্ঞেস করতে পারেন, সূক্ষ্মদেহের বিভিন্ন অংশ নির্মাণ তো হলো। কিন্তু, মন, বুদ্ধি ইত্যাদি কীভাবে নির্মিত হয়? তার জন্য পিণ্ড কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর হলো এইগুলো নির্মাণের প্রয়োজন হয় না, কেননা এইগুলো ধ্বংসই হয় না। 

চতুর্থ অধ্যায়ে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার শ্লোক উদ্ধৃত করেছিলাম যেইখানে শ্রীকৃষ্ণ স্পষ্টভাবে আত্মার অমরত্বের কথা জানিয়েছেন। সনাতন ধর্মের অন্যান্য সকল গ্রন্থে এবং সূত্রেও আত্মা অবিনশ্বররূপে বিবেচিত হয়। 

আমার মায়ের শ্রাদ্ধের ৩–৪ দিন আগে মায়ের এক কাকা শ্রী স্বপন কুমার ভট্টাচার্য্যের সাথে কথা বলছিলাম। স্বপন কুমার ভট্টাচার্য্য একজন অত্যন্ত বিদ্বান ব্যক্তি। তিনি এই বিষয় সম্পর্কে সনাতনী অভিমত সেইদিন আমাকে বেশ সুন্দরভাবে বুঝিয়েছিলেন। মানুষের মৃত্যু হলে তাঁর শরীরের মৃত্যু হয়। দাহ বা সৎকারের মাধ্যমের তাঁর পঞ্চভূতের শরীর পঞ্চভূতেই বিলীন করে দেওয়া হয়। কিন্তু অবিনশ্বর আত্মা মৃত্যুর সাথে সাথেই শরীর ছেড়ে যায়। আর আত্মার সাথেই শরীর ছেড়ে যায় মানুষের বুদ্ধি, চিত্ত, অহং। যেই হেতু আত্মা ইত্যাদি এইগুলির মৃত্যুই হয় না, তাই পুনর্নির্মাণ অনাবশ্যক। পূরক পিণ্ডদানের মাধ্যমে শুধু ব্যক্তির সূক্ষ্ম দেহই গঠন প্রয়োজন হয়।

ঘাটকাজ — ৭ অগাস্ট ২০২৫ 

আমার মা স্বপ্না দত্তের দৈহিক মৃত্যু হয় রবিবার, ২৭ জুলাই ২০২৫ (১০ শ্রাবণ ১৪৩২)। আমার মায়ের জন্য ঘাটকাজ আয়োজিত হয় বৃহস্পতিবার, ৭ অগাস্ট ২০২৫ (২১ শ্রাবণ ১৪৩২)। স্থান বিবেকনগর ঝিল, যাদবপুর, কলকাতা। 

পুরোহিত শ্রী পাপন চক্রবর্তীর তত্ত্বাবধানে এই ঘাটশ্রাদ্ধ কাজ হয়। পুরোহিতমশাই বিবেকনগর কালীমন্দিরের একজন পুরোহিত, যেই মন্দিরে ঘাটকাজের পরের দিন মায়ের আত্মার শান্তি কামনায় শ্রাদ্ধকাজ করি। এই ঘাটকাজের সময় আমার সাথে আমার মামা শ্রী শুভব্রত ভট্টাচার্য্য উপস্থিত ছিলেন। 

সকাল আটটা চল্লিশ নাগাদ বিবেকনগর ঝিলের উত্তরদিকের ঘাটে কাজ আরম্ভ হয়। আকাশ মেঘমুক্ত এবং আবহাওয়া নাতিশীতোষ্ণ ছিল।

আসনশুদ্ধি

প্রথমে আসনশুদ্ধি। আসনশুদ্ধি মানে হলো যেই স্থানে বসে কাজটি করা হবে, সেই স্থানটিকে শুদ্ধ করা। পারলৌকিক কাজ বা ধর্মীয় কাজ করার সময় স্থান ও পরিবেশের শুদ্ধতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুরোহিত মন্ত্র পাঠের মাধ্যমে আসন বা কাজের স্থানটি শুদ্ধ অথবা পবিত্র করেন। এইক্ষণে সংকল্প নেওয়া হয় যে আমাদের কাজটি একটি পবিত্র উদ্দেশ্য নিয়ে করা হচ্ছে এবং এখানে কোনো বাহ্যিক বাধা গ্রহণযোগ্য নয়।

প্রায়শ্চিত্ত

আসনশুদ্ধির পরের ধাপ প্রায়শ্চিত্ত। প্রায়শ্চিত্তের মূল উদ্দেশ্য হলো অশৌচকালের সময়ে নিজের বা পরিবারের সদস্যদের দ্বারা যদি ভুল বা ত্রুটি হয়ে থাকে, বা আন্তরিকতা এবং একাগ্রতার অভাব থেকে থাকে, তার জন্য অনুশোচনা করা এবং ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা।

যদিও ঈশ্বরচর্চা বা আস্তিকতা–নাস্তিকতা এই অধ্যায়ের বা পরিচ্ছেদের বিষয় নয়, তবু একটা কথা বলি। যতদূর বোধ হয় এই ভুল–ত্রুটির জন্য ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা প্রার্থনার মূল বিষয় হলো একজন ব্যক্তির নিজের মনের — নিজের অন্তরাত্মার কাছেই ক্ষমা প্রার্থনা বা অনুশোচনা করা। ধর্মের দিক থেকে দেখলেও ধর্ম শেখায় ঈশ্বর মানুষের হৃদয়েই অধিষ্ঠান করেন। সেই ক্ষেত্রে, প্রায়শ্চিত্তের আরেক অর্থ হয় নিজেরই মনের কাছে অনুশোচনা প্রকাশ আর একই ভুল–ত্রুটি যেন ভবিষ্যতে না হয়, সেই বিষয়ে সর্বজ্ঞ ঈশ্বরকে সাক্ষী করে সংকল্পগ্রহণ। 

পুরোহিতমশাইয়ের নির্দেশ অনুযায়ী মন্ত্রপাঠের মাধ্যমে প্রায়শ্চিত্ত সংকল্প হয়।

বিবেকনগর ঝিলের ঘাটে ঘাটকাজের একটি মুহূর্তের ছবি। ছবিতে দু'জন পুরুষকে মেঝেতে বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে। পুরোহিত শ্রী পাপন, যিনি লাল পোশাকে আছেন, তিনি একটি কলার পাতার উপর পিণ্ড তৈরির উপকরণগুলো নিয়ে কাজ করছেন। তার পাশে সাদা কাপড় পরে আছেন টিটো দত্ত, যিনি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছেন। তাদের পিছনে একটি সিমেন্টের বেঞ্চ এবং একটি দেওয়াল দেখা যাচ্ছে।
ঘাটকাজের সময় পিণ্ড তৈরির কাজ চলছে।

পিণ্ডদানপর্ব

এরপর শ্রী বিষ্ণুকে স্মরণ করে পিণ্ডদানের কাজ আরম্ভ হয়। এইটিই ঘাটশ্রাদ্ধের প্রধান অংশ। আতপ চাল, তিল, কলা, এবং মিষ্টি (সন্দেশ) দিয়ে ১১টি ছোট ছোট গোলাকার পিণ্ড তৈরি করি। অনেকে ঘি, মধু, কিছু কিছু প্রথা অনুযায়ী, আতপ চালের পাশাপাশি যবের আটাও পিণ্ড তৈরিতে ব্যবহার করেন। তবে আমরা আমার মায়ের ঘাটশ্রাদ্ধে এইসকল সামগ্রী ব্যবহার করিনি।

ॐ বিষ্ণু, ॐ বিষ্ণু, ॐ বিষ্ণু। (অথবা নমোঃ বিষ্ণু, নমোঃ বিষ্ণু, নমোঃ বিষ্ণু)।

ॐ। অদ্য কৃষ্ণপক্ষে, শ্রাবণমাসস্য একবিংশতিতমে দিনে, বৃহস্পত্যহ্নে, অহং বিষ্ণোঃ চরণযোঃ স্থিত্বা, মম গোত্রং শাণ্ডিল্যম্ ইতি, মম নাম টিটো দত্ত ইতি উচ্চারয়ামি। শাণ্ডিল্যগোত্রজা মাতা স্বপ্না দত্তায়াঃ প্রেতত্বমোক্ষার্থং তস্যাঃ শ্রাদ্ধনিমিত্তং চ, বিবেকনগরঝিলতটে তস্যাঃ পিতৃলোকপ্রাপ্তয়ে অস্য শ্রাদ্ধকর্মাঙ্গভূতং ঘাটকার্যং অহং সম্পাদয়ামি।

[অনুবাদ: ॐ। আজ কৃষ্ণপক্ষের শ্রাবণ মাসের একবিংশ তিথিতে, বৃহস্পতিবারে, আমি বিষ্ণুর চরণে আশ্রয় গ্রহণ করছি — আমার গোত্র শাণ্ডিল্য, আমার নাম টিটো দত্ত। শাণ্ডিল্য গোত্রীয়া আমার মাতা স্বপ্না দত্তের প্রেতত্ব মোক্ষের জন্য এবং তাঁর শ্রাদ্ধ উপলক্ষ্যে, বিবেকনগর ঝিলতটে তাঁর পিতৃলোকপ্রাপ্তির উদ্দেশ্যে, এই শ্রাদ্ধকর্মের অন্তর্ভুক্ত ঘাটকার্য আমি সম্পাদন করছি।]

এইরূপ অবস্থান উচ্চারণ করে ঘাটকাজের পিণ্ডদান পর্ব দান শুরু হয়। বিভিন্ন মন্ত্রের সাথে সূর্যপ্রণাম মন্ত্র এবং গায়ত্রী মন্ত্রও উচ্চারিত হয়। সর্বমোট ১১টি পিণ্ডদান করি। 

  1. ॐ শাণ্ডিল্যগোত্রস্য মাতুঃ স্বপ্না দত্তায়াঃ এষ তে মস্তকরূপঃ পিণ্ডঃ স্বাহা। (অনুবাদ: ॐ। আমার মা, স্বপ্না দত্ত, শাণ্ডিল্য গোত্রের, এই পিণ্ডটি তাঁর পারলৌকিক শরীরের মস্তক নির্মাণে উৎসর্গ করা হলো।)
  2. ॐ শাণ্ডিল্যগোত্রস্য মাতুঃ স্বপ্না দত্তায়াঃ এষ তে স্কন্ধবাহুরূপঃ পিণ্ডঃ স্বাহা। (অনুবাদ: ॐ। আমার মা, স্বপ্না দত্ত, শাণ্ডিল্য গোত্রের, এই পিণ্ডটি তাঁর কাঁধ ও বাহুর অঙ্গ নির্মাণে উৎসর্গ করা হলো।)
  3. ॐ শাণ্ডিল্যগোত্রস্য মাতুঃ স্বপ্না দত্তায়াঃ এষ তে বক্ষঃকণ্ঠরূপঃ পিণ্ডঃ স্বাহা। (অনুবাদ: ॐ। আমার মা, স্বপ্না দত্ত, শাণ্ডিল্য গোত্রের, এই পিণ্ডটি তাঁর বক্ষ ও কণ্ঠের অঙ্গ নির্মাণে উৎসর্গ করা হলো।)
এইভাবে বেশ কিছু মন্ত্র পাঠের মাধ্যমে দশটি পিণ্ডদান করি। এগারোতম পিণ্ডটি কাকের উদ্দেশ্যে ছিল। 
ॐ যমায় নমঃ। ॐ কাকায় নমঃ। এষ পিণ্ডঃ কাকায় স্বাহা। (অনুবাদ: ॐ। যমকে প্রণাম। কাককে প্রণাম। এই পিণ্ডটি কাকের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হলো।)

ঘাটকাজ — শেষ অংশ

পিণ্ডদানের পর বিষ্ণু, শিব, এবং যমকে প্রণাম করে এইদিনের ঘাটকাজ শেষ করি। 

ঘাটশ্রাদ্ধের এই পুরো কাজ করতে প্রায় ৫০ মিনিট মতো সময় লেগেছিল। এরপর, আমাদের পাড়ার একটা সেলুনে ক্ষৌরকার্য হয়। সেলুনের নাপিতকে আগে থেকেই জানানো ছিল। সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ এইদিনের কাজ সম্পূর্ণ হয়।

চতুর্থ অধ্যায়, দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ — ঘাটকাজপর্ব — এইখানেই শেষ করলাম।

চরৈবেতি।

দ্রষ্টব্য: এই লেখাটি আপনি স্বপ্না দত্ত ওয়েবসাইটেও পড়তে পারেন।

স্বপ্না দত্ত, আমার মা (Swapna Dutta, my Mother)


This page was last updated on: 12 August 2025
Number of revisions on this page: 2
Internet Archive Backup: See here

Saturday, August 09, 2025

স্বপ্না দত্ত, আমার মা: চতুর্থ অধ্যায়, প্রথম পরিচ্ছেদ

গতকাল, শুক্রবার, ৮ অগাস্ট ২০২৫ (২২ শ্রাবণ ১৪৩২), আমার মা স্বপ্না দত্তের শ্রাদ্ধকাজ হয়েছে। এর আগের দিন, বৃহস্পতিবার, ৭ অগাস্ট ২০২৫ (২১ শ্রাবণ ১৪৩২) ঘাটকাজ (ঘাটশ্রাদ্ধ) করা হয়েছে। এখন চতুর্থ অধ্যায় — শ্রাদ্ধ অধ্যায় লেখার সময়। 

এই লেখা শুরু করার পর বেশ কিছু ঘণ্টা পরে দেখছি লেখাটা অত্যধিক দীর্ঘ হয়ে পড়ছে যা আমার লেখা এবং আপনার পড়া, দুইয়ের জন্যেই অসুবিধা। তাই, এই চতুর্থ অধ্যায়টিকে তিনটি আলাদা পরিচ্ছেদে ভাগ করছি— ১) উপক্রমণিকা: শ্রাদ্ধ এবং শ্রদ্ধা, ২) ঘাটকাজপর্ব, ৩) শ্রাদ্ধদিবস। 

আপাততঃ চতুর্থ অধ্যায়, প্রথম পরিচ্ছেদ শুরু করছি। অনুমতি দেবেন।

একজন মহিলা নীল ও সোনালি শাড়ি পরিহিত, হাত জোড়া করে প্রার্থনা করছেন। পেছনে একটি মন্দিরের মূর্তিতে দেবী দুর্গা এবং অন্যান্য দেবদেবীদের ভাস্কর্য দেখা যাচ্ছে।
স্বপ্না দত্ত, আমার মা।
নৈমিষারণ্য মন্দির প্রাঙ্গণে। নৈমিষারণ্য বর্তমানে উত্তর প্রদেশ রাজ্যে।
৭ অক্টোবর ২০১৯ তারিখের ছবি।

শ্রাদ্ধ এবং শ্রদ্ধা

শ্রাদ্ধের মূল উদ্দেশ্য হলো মাতা, পিতা বা পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তি ও মুক্তি নিশ্চিত করা। এটি এমন একটি অনুষ্ঠান যা জীবিত ও মৃতের মধ্যে এক অদৃশ্য সেতু নির্মাণ করে। এই অনুষ্ঠানে পূর্বপুরুষদের স্মরণ করা হয়, এবং তাঁদের ঋণ স্বীকার করে তাঁদের আত্মার শান্তি প্রার্থনা করা হয়।

সনাতন ধর্ম অনুসারে আত্মা অমর, অক্ষয়, অবিনশ্বর। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ২.২০ শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন— "न जायते म्रियते वा कदाचिन्, नायं भूत्वा भविता वा न भूयः। अजो नित्यः शाश्वतोऽयं पुराणो, न हन्यते हन्यमाने शरीरे॥" (বাংলা লিপি: "ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিৎ নায়ং ভূত্বা ভবিতা বা ন ভূয়ঃ, অজো নিত্যঃ শাশ্বতোহয়ং পুরাণো, ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে।" বাংলা অনুবাদ: আত্মার কখনও জন্ম হয় না এবং কখনও মৃত্যু হয় না। সে কোনদিন অস্তিত্বহীনও হয়নি, ভবিষ্যতেও অস্তিত্বহীন হবে না। আত্মা জন্মহীন, নিত্য, শাশ্বত, শরীরের মৃত্যু হলে বা দেহকে হত্যা করলেও আত্মার মৃত্যু হয় না।")।

"শ্রাদ্ধ" শব্দটি এসেছে "শ্রদ্ধা" থেকে, যার অর্থ বিশ্বাস, নিষ্ঠা ও ভক্তি। শ্রাদ্ধের সময় শ্রদ্ধা মৃত ব্যক্তির প্রতি ভালোবাসা, সম্মান এবং কর্তব্যবোধের প্রকাশ।

​আপস্তম্ব ধর্মসূত্র অনুযায়ী "श्रद्धया दीयते यत्तत् श्राद्धम्।" (বাংলা লিপি: "শ্রদ্ধয়া দীয়তে যত্তৎ শ্রাদ্ধম্। বাংলা অনুবাদ: শ্রদ্ধার সাথে দেওয়া হয়, তাই হলো শ্রাদ্ধ")।

মনুসংহিতায় বেশ কয়েকবার শ্রাদ্ধ সম্পর্কে বলা হয়েছে। শ্লোক ৩.৮২: "कुर्यादहरः श्राद्धं अन्नाद्येनोदकेन वा। पयोमूलफलैर्वापि पितृभ्यः प्रीतिमावहन्।।" (বাংলা লিপি: "কুর্যাদহরঃ শ্রাদ্ধং অন্নাদ্যেনোদকেন বা, পয়োমূলফলাইর্‌বাপি পিতৃভ্যঃ প্রীতিমাবহন্"। বাংলা অনুবাদ: "গৃহস্থ ব্যক্তি যদি অন্ন, জল, দুধ, শাক-ফল ইত্যাদি দিয়ে শ্রাদ্ধ করেন, তবে তা পূর্বপুরুষদের অনুগ্রহ–প্রাপ্তির আধার হয়॥")। 

মনুসংহিতায় শ্লোক ৩.২৭৫–এ বলা হয়েছে— "यद् यद् ददाति विधिवत् सम्यक् श्रद्धासमन्वितः। तत् तत् पितॄणां भवति परत्रानन्तमक्षयम्।। (বাংলা লিপি: "যদ্ যদ্ দদাতি বিধিবৎ সম্যক্ শ্রদ্ধাসমন্বিতঃ, তৎ তৎ পিতৃণাং ভবতি পরত্রানন্তমক্ষয়ম্"। বাংলা অনুবাদ: "যে ব্যক্তি নিয়ম অনুযায়ী, সতত ও বিশ্বাসসহ দান করেন, তাঁর জন্য পিতৃরা পরলোকেও অনন্য ও অবিনশ্বর ফল লাভ করেন॥)"।

সুবলচন্দ্র মিত্র সংকলিত "সরল বাঙ্গালা অভিধান"(অষ্টম সংস্করণ) থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী "শ্রাদ্ধ" শব্দটি একটি বিশেষণ। শব্দ + ষ্ণ যুক্তার্থে "শ্রাদ্ধ" শব্দের ব্যুৎপত্তি। এই শব্দের মূল অর্থ "শ্রদ্ধাযুক্ত"। মৃত ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধাপূর্বক অনুষ্ঠিত দানাদি কার্য, পিতৃকৃত্য।

একটা জিনিস স্পষ্টতঃ বোঝা যাচ্ছে — শ্রাদ্ধের সাথে শ্রদ্ধার একেবারে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। আজ এই লেখা শুরুর কিছুক্ষণ আগে রিক্সা চেপে গরফা কথামৃত উদ্যানের সামনের রাস্তা দিয়ে আসছিলাম। প্রাচীরে কয়েকটি সুন্দর ভাস্কর্য আর চিত্রকলা রয়েছে। এইগুলো আগেও রাস্তা দিয়ে যেতে আসতে চোখে পড়েছিল, এইবার স্বামী বিবেকানন্দের একটি উক্তি হয়তো একটু বেশীই মন ছুঁয়ে গেল। 

সেটি স্বামী বিবেকানন্দের একটি উক্তি। একটি প্রাচীরের ওপর রিলিফ বা ভাস্কর্যের মতো করে লেখা আছে। উক্তিটি হলো: "যদি সত্যিই মন থেকে কিচ্ছু করতে চাও তাহলে পথ পাবে, আর যদি না চাও তাহলে অজুহাত পাবে।"
"যদি সত্যিই মন থেকে কিছু করতে চাও, তাহলে পথ পাবে, আর যদি না চাও তাহলে অজুহাত পাবে।" — স্বামী বিবেকানন্দ।

শ্রাদ্ধের ক্ষেত্রেও মনোযোগ এবং আন্তরিকতা একান্ত আবশ্যক। শ্রীমদ্ভগবদগীতা ১৭.২৮ শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন— "अश्रद्धया हुतं दत्तं तपस्तप्तं कृतं च यत्। असदित्युच्यते पार्थ न च तत्प्रेत्य नो इह॥" (বাংলা লিপি: "অশ্রদ্ধয়া হুতং দত্তং তপস্তপ্তং কৃতং চ যৎ। অসদিত্যুচ্যতে পার্থ ন চ তত্‌ প্রেত্য নো ইহ॥" বাংলা অনুবাদ: "হে পার্থ ! অশ্রদ্ধা সহকারে হোম, দান বা তপস্যা যা কিছু অনুষ্ঠিত হয়, তাকে বলা হয় 'অসৎ'৷ সেইসমস্ত ক্রিয়া ইহলোকে ও পরলোকে ফলদায়ক হয় না॥")

শুধুমাত্র সনাতন ধর্মই নই। অন্যান্য সকল ধর্ম ও সম্প্রদায় — আস্তিক, নাস্তিক, অজ্ঞেয়বাদী — বিজ্ঞানী, দার্শনিক, বস্তুবাদী — সকলেই নিষ্ঠার সাথে, শ্রদ্ধার সাথে, মনোযোগ দিয়ে যে কোনও কাজ করতে বলে থাকেন।

ইসলামে "খুশু" (আরবী: خشوع) শব্দের অর্থ নামাজের সময় হৃদয়ের বিনয়, মনোযোগ ও গভীরতাসহ আল্লাহ–র স্মরণ করা। আল্লাহ স্থান–কাল–পাত্র দেখেন না। এক ব্যক্তি প্রচুর ধনসম্পত্তির অধিকারী অথবা দরিদ্র; এক ব্যক্তি সুশোভিত স্বর্ণমহলে বসে নামাজ পড়ছেন, নাকি ছোট কুঁড়েঘরে থেকে — আল্লাহ তা দেখেন না। একমাত্র মনোযোগ আর শ্রদ্ধার সাথে নামাজ পড়লেই — আল্লাহকে স্মরণ করলে — আল্লাহ তা কবুল করেন।

বৌদ্ধ ধর্ম অনুসারে— "অবহেলা-মুক্ত মনোযোগ হলো অমরত্বের পথ; অবহেলা হলো মৃত্যুর পথ। যাঁরা মনোযোগ সহকারে কাজ করেন, তাঁদের মৃত্যু হয় না; অবহেলাকারীরা জীবিত থেকেও মৃতের ন্যায়" (ধম্মপদ ২৪)। কালাম সুত্ত (সূত্র)–তে গৌতম বুদ্ধ বলেছেন— "শুধু শোনা কথা, প্রথা, গুজব, শাস্ত্র, যুক্তি বা গুরু বললেন বলে কিছু বিশ্বাস করো না। যখন বুঝবে, কিছু কল্যাণকর, নৈতিক ও উপকারী — তখনই তা গ্রহণ ও অনুশীলন করো।" মহাপরিনিব্বাণ সুত্ত, বুদ্ধদেবের জীবনের শেষ উপদেশেও, তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন— "অবহেলা–মুক্ত হয়ে সাধনা সম্পন্ন করো"।

ওপরের অনুচ্ছেদগুলিতে বেশ কিছু উক্তি তুলে ধরেছি। এই বিষয়ে আরও অনেক বাণী এবং অভিমত সংগ্রহ করা যেতেই পারে। যেইটা স্পষ্ট বুঝতে পারছি এই বিষয়ে "নানা মুনির নানা মত" নয় — সব মুনিরই এক মত। "শ্রাদ্ধ" এবং যে কোনও গুরুত্বপূর্ণ কাজে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ এবং হয়তো বা একমাত্র প্রয়োজন হলো শ্রদ্ধা — মনোযোগ —আন্তরিকতা।

ঋণত্রয়

সনাতন ধর্ম অনুসারে জীবনের উপর মানুষের কিছু চিরন্তন দায় ও কর্তব্য আছে। শাস্ত্রমতে, প্রত্যেক মানুষ জন্মের সঙ্গে সঙ্গে তিনটি ঋণ নিয়ে আসে — দেবঋণ, ঋষিঋণ, পিতৃঋণ। এইগুলো পরিশোধ করা গৃহস্থ জীবনের অন্যতম ধর্ম।

  1. দেবঋণ (দেবতাদের প্রতি ঋণ): বেদ অনুযায়ী দেবতারা প্রকৃতি ও মহাজাগতিক শক্তির প্রতীক — সূর্য, চন্দ্র, বায়ু, অগ্নি, বরুণ ইত্যাদি। এঁরা জীবন ও জীবিকার জন্য অনন্ত দান করে চলেছেন। যজ্ঞ, পূজা ও প্রার্থনার মাধ্যমে মানুষ দেবঋণ শোধ করে। ঋগ্বেদে বলা হয়েছে— "देवान्भावयतानेन ते देवा भावयन्तु वः।" (বাংলা লিপি: "দেবান্ভাবযতানেন তে দেবা ভাবযন্তু বঃ"। বাংলা অনুবাদ: "তোমরা যজ্ঞ ও উপাসনায় দেবতাদের পূজা করো, দেবতারাও তোমাদের কল্যাণ করবেন।")
  2. ঋষিঋণ (গুরু ও জ্ঞানের প্রতি ঋণ): যে জ্ঞান, বেদ ও ধর্মশিক্ষা আমাদের কাছে এসেছে, তা ঋষিদের অবদান। তাঁদের গবেষণা, সাধনা ও অনুশাসন মানুষের আধ্যাত্মিক উন্নতির পথ খুলে দিয়েছে মনুসংহিতা (২.৬) অনুযায়ী: "वेदोऽखिलो धर्ममूलं स्मृतिशीले च तद्विदाम्।" (বাংলা লিপি: "বেদোহখিলো ধর্মমূলং স্মৃতিশীলে চ তদ্বিদাম্"। বাংলা অনুবাদ: "সকল বেদই ধর্মের মূল, আর স্মৃতি ও শীল সেই জ্ঞানীদের জীবনপথ।")
  3. পিতৃঋণ (পূর্বপুরুষের প্রতি ঋণ): মানুষের জন্ম, বংশধারা ও সামাজিক পরিচয় — সবই পূর্বপুরুষদের দান। তাই জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পর তাঁদের শান্তির জন্য ক্রিয়া করা প্রত্যেকের কর্তব্য। পিতৃঋণ শোধ হয় শ্রাদ্ধ, পিণ্ডদান, তর্পণ ও বংশধারা রক্ষার মাধ্যমে। শ্রাদ্ধ–ক্রিয়াই পিতৃঋণ মুক্তির প্রধান মাধ্যম।

শ্রাদ্ধ — তিথি, প্রকার

ষোড়শ শ্রাদ্ধ

শ্রাদ্ধের প্রধান প্রকারভেদ ধর্মশাস্ত্র অনুযায়ী ১৬ প্রকার। বর্ণানুক্রমিক ভাবে—

  1. অপিদান শ্রাদ্ধ: অতৃপ্ত আত্মাদের জন্য, যাঁদের কেউ স্মরণ করে না, যাঁদের আত্মা অতৃপ্ত। "অপিদানিক" বা "অপকৃত" শ্রাদ্ধ নামেও পরিচিত। 
  2. অগ্নিহোত্রী শ্রাদ্ধ: যাঁরা অগ্নিহোত্র যজ্ঞ পালন করেন, তাঁদের জন্য নির্দিষ্ট শ্রাদ্ধ। কিছু ক্ষেত্রে এইটি নৈমিত্তিক শ্রাদ্ধের অংশ হিসেবে ধরা হয়।
  3. আদ্যশ্রাদ্ধ: প্রথমবারের শ্রাদ্ধ, মৃত্যুর পরে একাদশ, ত্রয়োদশ বা নির্দিষ্ট দিনে। গত ৮ অগাস্ট ২০২৫ আমার মায়ের জন্য এই শ্রাদ্ধ পালিত হয়েছে। একে প্রথমোদ্দিষ্ট শ্রাদ্ধও বলা হয়।
  4. একোদ্দিষ্ট শ্রাদ্ধ: বিশেষ এক ব্যক্তির জন্য নির্দিষ্ট বা উদ্দিষ্ট শ্রাদ্ধ। এইটি অনেকে মাসিক শ্রাদ্ধ হিসাবে প্রতি মাসে করেন। এইভাবে এক বছর পর্যন্ত মোট ১২টি শ্রাদ্ধ করা হয়।
  5. কর্মাঙ্গ শ্রাদ্ধ: বিশেষ ধর্মীয় কর্ম বা যজ্ঞের অঙ্গ হিসেবে এই শ্রাদ্ধ করা হয়।
  6. কাম্য শ্রাদ্ধ: কোনও বিশেষ কামনা বা উদ্দেশ্যে।
  7. গোষ্ঠী শ্রাদ্ধ: একত্রে অনেকের শ্রাদ্ধ।
  8. তীর্থযাত্রা শ্রাদ্ধ: কোনো তীর্থস্থানে গিয়ে এই শ্রাদ্ধ করা হয়, বিশেষত গয়া-তে শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান খুব প্রচলিত।
  9. ত্রিপক্ব শ্রাদ্ধ: তিন পূর্ব প্রজন্মের জন্য একসাথে শ্রাদ্ধ।
  10. নিত্য শ্রাদ্ধ: দৈনন্দিন পিতৃতর্পণ।
  11. নৈমিত্তিক শ্রাদ্ধ: বিশেষ কোনও কারণে, যেমন সূর্যগ্রহণ, কোনও বিশেষ পূজা ইত্যাদিতে।
  12. পার্বণ শ্রাদ্ধ: প্রতি মাসের অমাবস্যা বা বিশেষ তিথিতে।
  13. পুষ্টিশ্রাদ্ধ: সুস্বাস্থ্য, ধন–সম্পদ ও দীর্ঘায়ু লাভের জন্য।
  14. বার্ষিক শ্রাদ্ধ: প্রতি বছর ব্যক্তির মৃত্যুর তিথিতে।
  15. শুদ্ধি শ্রাদ্ধ: মৃত্যুর পর পরিবারের শুদ্ধি লাভের জন্য।
  16. সপিণ্ডীকরণ শ্রাদ্ধ: এক বছর কালাশৌচ পালন করার পর মৃত্যু তিথিতে যে শ্রাদ্ধ করা হয়।

দ্রষ্টব্য, ১৬টি শ্রাদ্ধের সুনির্দিষ্ট তালিকা বিভিন্ন সম্প্রদায়, অঞ্চল এবং মতবাদে ভিন্ন হতে পারে। তবে, মূল বিষয় হলো, মৃত্যুর পর থেকে এক বছর পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত আত্মার শান্তির জন্য এবং তাকে পরলোকে সঠিক পথ দেখানোর জন্য বিভিন্ন সময়ে এই শ্রাদ্ধকর্মগুলো সম্পন্ন করা হয়। এই সবকটি শ্রাদ্ধকেই একত্রে "ষোড়শ শ্রাদ্ধ" বলা হয়, যা একটি সামগ্রিক ধারণাকে প্রকাশ করে।

আদ্যশ্রাদ্ধ

পিতামাতা, বা আত্মীয়–বন্ধুর মৃত্যুর পর অশৌচপালনের পর যেই শ্রাদ্ধকাজ করা হয়, তাকে আদ্যশ্রাদ্ধ বলা হয়। প্রথমবার উদ্দিষ্ট হয় বলে একে প্রথমোদ্দিষ্ট শ্রাদ্ধ বলা হয়।

সনাতন ধর্ম অনুসারে কোনও ব্যক্তির মৃত্যুর পর সাধারণতঃ ব্রাহ্মণদের ক্ষেত্রে ১০ দিনে বা ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, এবং শূদ্রদের ক্ষেত্রে ১৩ দিনে শ্রাদ্ধ হয়। তবে এই নিয়মের বিভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। মনুসংহিতায় ৫:৮৩ শ্লোক অনুযায়ী— "शुद्ध्येद्विप्रो दशाहेन द्वादशाहेन भूमिप। वैश्यम् पञ्चदशाहेन शूद्रो मासेन शुद्ध्यति॥"(বাংলা লিপি: "শুধ্যেদ্বিপ্রো দশাহেন দ্বাদশাহেন ভূমিপ। বৈশ্যপঞ্চদশাহেন শূদ্রো মাসেন শুধ্যতি॥" বাংলা অনুবাদ: "ব্রাহ্মণ বর্ণের জন্য ১০ দিন, ক্ষত্রিয় বর্ণের জন্য ১২ দিন। বৈশ্য বর্ণের জন্য ১৫ দিন ও শূদ্র বর্ণের ৩০ দিন অশৌচ বিধান নির্ধারিত॥")। 

এছাড়াও, আঞ্চলিক বা সাম্প্রদায়িক প্রথা ও ব্যক্তি বা পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এইটা কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে। স্বামী জীবিত থাকাকালীন অপুত্রক/নিঃসন্তান অবস্থায় স্ত্রীর মৃত্যু হলে, কিছু সনাতনী নবমী তিথিতে তাঁদের শ্রাদ্ধ করেন (যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে একাদশ, ত্রয়োদশ ইত্যাদি দিবসেই শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান হয়)। নাথ সম্প্রদায়ে অবিবাহিত মৃতা মহিলার শ্রাদ্ধ মৃত্যুর পর চতুর্থ দিনে হয়। আর কোনও অবিবাহিতা মহিলা যদি তাঁর মৃত পিতা বা মাতার শ্রাদ্ধ করেন, সেইটিও মৃত্যুর পর চতুর্থ দিনে হয়।

ব্যক্তির মৃত্যু থেকে শ্রাদ্ধ কাজ শেষ হওয়া অবধি সময় এবং কার্যকালকে মূলতঃ পাঁচটি ভাগে ভাগ করা যায়।

  1. অন্ত্যেষ্টি: মৃতদেহ সৎকার বা দাহ। একে "শেষ যজ্ঞ"–ও বলা হয়। "অন্ত্যেষ্টি" শব্দটি "অন্ত্য" ও "ইষ্টি" এই দুইটি শব্দ যোগ করে, যার অর্থ যথাক্রমে "শেষ" ও "যজ্ঞ"।
  2. অশৌচ: অশৌচ শব্দের অর্থ হলো শুচিতা বা পবিত্রতার অভাব। মৃত্যুর পর পরিবার যে নির্দিষ্ট সময় শুচিহীন বা শুদ্ধিহীন থাকে।
  3. ঘাটকাজ বা ঘাটশ্রাদ্ধ: ব্রাহ্মণদের ক্ষেত্রে মৃত্যুর দিন থেকে দশম দিনে এবং অন্যান্য বর্ণের ক্ষেত্রে একাদশ দিনে নদী বা পুকুরের ঘাটে পূরক পিণ্ড দান করা হয়। আমাদের নদীমাতৃক সভ্যতা। তাই নদীর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নদী কাছাকাছি না থাকলে পুকুর বা দীঘির ঘাটে এই কাজ করা যেতে পারে। "পূরক পিণ্ড" অর্থ এই দিন যে পিণ্ডদান করা হয় সেইটা মৃত ব্যক্তির আহার হিসাবে নয়, বরং মৃত ব্যক্তির পারলৌকিক দেহ গঠনের উদ্দেশ্যে। এইদিন ক্ষৌরকার্যও সম্পন্ন হয়। অশৌচ পালনকারী পুরুষ ব্যক্তির মস্তকমুণ্ডন এবং গোঁফ–দাড়ি কাটা হয়।
  4. শ্রাদ্ধ: মৃত ব্যক্তির স্মরণ, তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। আত্মার জন্য তর্পণ, অন্ন–জল দান, ব্রাহ্মণ ভোজন ও মন্ত্রোচ্চারণ।
  5. নিয়মভঙ্গ: অশৌচ শেষে পুনরায় স্বাভাবিক ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মে প্রবেশ করার সময়। শ্রাদ্ধের পর প্রথম বা দ্বিতীয় দিনে এই নিয়মভঙ্গ অনুষ্ঠিত হয়। এইদিন আদ্যশ্রাদ্ধ পর্ব শেষ হয়।

অথঃ গরুড়পুরাণ কথা

শ্রাদ্ধবিষয়ক লেখা লিখতে গিয়ে গরুড়পুরাণ–এর কথা উল্লেখ করা আবশ্যক। গরুড়পুরাণ সনাতন ধর্মের প্রধান আঠারোটি মহাপুরাণের একটি, যা মূলতঃ বিষ্ণু ও তাঁর বাহন গরুড়ের সংলাপ আকারে রচিত। এর "প্রেতখণ্ড" অংশে মৃত্যু, আত্মার যাত্রাপথ, যমলোকের বিবরণ, পাপ–পুণ্যের ফল, এবং পুনর্জন্মের প্রক্রিয়া বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। মৃত্যুর পর আত্মা কীভাবে দেহ ত্যাগ করে, অশৌচকাল, শ্রাদ্ধ ও পিতৃতর্পণের গুরুত্ব, এবং কর্মফল অনুযায়ী স্বর্গ, নরক বা পুনর্জন্ম লাভ করে, এইরকম বহু বিষয়ে আলোচনা রয়েছে। গরুড়পুরাণে মৃত্যুভয় দূর করার জন্য ভক্তি, সৎকর্ম ও ধর্মাচরণের উপর জোর দেওয়া হয়েছে।

প্রথম পর্বের যাত্রা: ১–১৩ দিন

গরুড়পুরাণ প্রেতখণ্ড অনুসারে মৃত্যুর পর আত্মার ১৩ দিনের যাত্রাপথ এইরকম—

  • প্রথম দিন: আত্মা মৃত্যুর পরপরই স্থূলদেহ ত্যাগ করে, তবে কিছু সময় নিজের দেহ ও আশপাশের পুরনো পরিবেশের সাথে যুক্ত থাকে।
  • দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম দিন: আত্মা ধীরে ধীরে নতুন এক মধ্যবর্তী দেহ (সূক্ষ্মদেহ) ধারণ করে এবং যমদূতের আহ্বানে যাত্রা শুরু করে। পরিবারের শ্রাদ্ধ ও পিণ্ডদান আত্মাকে শক্তি জোগায়।
  • ষষ্ঠ থেকে দশম দিন: আত্মা যমলোকের দিকে বিভিন্ন ক্লান্তিকর ও ভয়াবহ অঞ্চল অতিক্রম করে। পিণ্ড ও জলদান এই যাত্রায় খাদ্য ও শক্তি হিসেবে কাজ করে।
  • একাদশ দিন: আত্মা যমদূতের সঙ্গে যমলোকের দুয়ারে পৌঁছয় এবং কর্মফলের বিচার শুরু হয়।
  • দ্বাদশ দিন: ঘাটকাজ বা ঘাটশ্রাদ্ধের প্রার্থনার মাধ্যমে এই দিন আত্মার লুপ্তপ্রায় সূক্ষ্ম দেহ পিণ্ডজ শরীরে রূপান্তরিত হয়।
  • ত্রয়োদশ দিন: শ্রাদ্ধের মাধ্যমে আত্মার যাত্রাপথ সুগম, শান্তিময় ও প্রশস্ত করা হয়।

দ্বিতীয় পর্বের যাত্রা: ১৪–৩৬১ দিন

চতুর্দশ দিনে আত্মা যমলোকের মূলপথে যাত্রা শুরু করে। এই যাত্রা খুবই দীর্ঘ এবং কষ্টকর। আত্মাকে নানা কঠোর পরীক্ষা এবং বাধা অতিক্রম করতে হয়। এই সম্পূর্ণ পথ অতিক্রম করতে আত্মার প্রায় এক বছর (দিনের হিসাবে ৩৪৮ দিন) সময় নেয়। 

মৃত্যুর পর শ্রাদ্ধের দিন অবধি ১৩ দিন + ৩৪৮ দিনের যমলোকে যাত্রা = ৩৬১ দিন — পারলৌকিক যাত্রার সময়। ব্রাহ্মণ বর্ণের ক্ষেত্রে এইটি ৩৫৯ দিন হবে। এছাড়া বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মতভেদে এই সংখ্যাটি সামান্য এদিক–ওদিক হতে পারে। 

স্বর্গ অথবা নরক

গরুড়পুরাণ অনুসারে ৩৫৯ অথবা ৩৬১ দিনের এই যাত্রা শেষে আত্মার যমলোকের বিচার সম্পূর্ণ হয় এবং তার পরবর্তী গন্তব্য নির্ধারিত হয়। সৎকর্ম ও অসৎকর্মের বিচার করে সিদ্ধান্ত হয় মৃত ব্যক্তি স্বর্গে অথবা নরকে যাবেন। সৎকর্মের প্রাধান্য থাকলে আত্মা স্বর্গে (ইন্দ্রলোকে) প্রেরিত হয়, যেখানে তিনি সুকর্মের ফল পান। অসৎকর্মের প্রাধান্য থাকলে আত্মা নরকে শাস্তি পান। মিশ্র ফল থাকলে আত্মা আংশিকভাবে উভয় অভিজ্ঞতা লাভ করেন।

লক্ষ্যণীয়, গরুড়পুরাণ স্বর্গের এবং নরকের বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। গরুড়পুরাণে স্বর্গকে সৎকর্মের ফলপ্রাপ্তির স্থান হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যেখানে আত্মা আনন্দ, শান্তি ও সমৃদ্ধির অভিজ্ঞতা লাভ করে। স্বর্গে দেবলোক, ইন্দ্রলোক, গন্ধর্বলোক ইত্যাদি বিভিন্ন স্তর আছে। এখানে বাসিন্দারা অমৃত পান করে, দেবতাদের সান্নিধ্যে থাকে, গন্ধর্বদের সঙ্গীত ও অপ্সরাদের নৃত্য উপভোগ করে। রত্নখচিত প্রাসাদ, সুগন্ধি বাগান, নিরবচ্ছিন্ন আলো ও কষ্টহীন জীবন — এইসব স্বর্গের বৈশিষ্ট্য।

নরককে আত্মার অসৎকর্মের শাস্তির স্থান হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এই পুরাণে ২৮ প্রকার নরকের নাম এবং প্রদত্ত নরক যন্ত্রনার উল্লেখ আছে, যেমন রৌরব, মহারৌরব, তমিস্র, অন্ধতমিস্র, কুম্ভিপাক, কালসূত্র, অন্ধকূপ ইত্যাদি। প্রতিটি নরকে নির্দিষ্ট পাপ যেমন যেমন চুরি, হত্যা, ব্যভিচার, প্রতারণা বা গুরু–অপমানের জন্য বিভিন্ন রকম শাস্তি। এইসকল শাস্তির মধ্যে রয়েছে আগুনে পোড়ানো, বরফের জলে ডুবিয়ে রাখা, ধারালো অস্ত্রে বিদ্ধ করা, হিংস্র প্রাণীর দ্বারা আক্রমণ, ক্ষুধা–তৃষ্ণার অসহনীয় কষ্ট ইত্যাদি। এই শাস্তি শেষ না হওয়া পর্যন্ত আত্মা সেখানে অবস্থান করে, তারপর অবশিষ্ট কর্মফল অনুযায়ী পুনর্জন্ম লাভ করে।

স্বর্গ অথবা নরকের এই অবস্থানের পর আত্মা পুনর্জন্মের জন্য প্রস্তুত হয়। নরক বা স্বর্গের ফল পাওয়ার পরে আত্মা তার কর্ম ও কর্মফল অনুযায়ী একটি নতুন মানবীগর্ভে প্রবেশ করে। এই গর্ভপ্রবেশও যমরাজের অনুমতি ও নিয়ম অনুযায়ী ঘটে।

বাৎসরিক শ্রাদ্ধ

বাৎসরিক শ্রাদ্ধ সাধারণত এই ৩৫৯ অথবা ৩৬১ দিনের শেষে (বা সৌরবর্ষ অনুযায়ী ৩৬৫ দিনে) পালন করা হয়, যা আত্মার যাত্রার সমাপ্তি সূচক। এইসময় প্রয়োজন একটি তিথি যেইদিন শ্রাদ্ধ কাজ করা যেতে পারে। ৩৫৯ দিনে ব্রাহ্মণদের বা ৩৬১ দিনে অন্যান্য সকল বর্ণের বাৎসরিক শ্রাদ্ধ করা যেতে পারে। আর যেহেতু, ব্যক্তির মৃত্যুর দিনটিই একটি তিথি, অধিকাংশ মানুষ মৃত্যুর এক বছর পর একই দিনে শ্রাদ্ধ করেন। অথবা, সেই মাসের অমাবস্যা তিথিতেও শ্রাদ্ধের কাজ করা যেতে পারে। আদ্যশ্রাদ্ধের মতোই বাৎসরিক শ্রাদ্ধেও স্মরণ, পূজা, পিণ্ডদান, হোম, ব্রাহ্মণভোজন ইত্যাদি থাকে। 

দাবি পরিত্যাগ (Disclaimers)

দাবি পরিত্যাগ নিয়ে কয়েকটি কথা বলি—

  1. আমি সনাতন ধর্ম অনুযায়ী শ্রাদ্ধের প্রক্রিয়া, এবং মৃত্যুর পর যাত্রার বর্ণনা দিয়েছি। কিন্তু এই বিষয়টি অত্যন্ত বিস্তারিত এবং বহু গ্রন্থে এর বিবরণ রয়েছে। তাই বর্তমান প্রবন্ধটিকে একটি সংক্ষিপ্ত রচনা হিসাবেই গণনা করবেন।
  2. বিষয়গুলো শুধু বিস্তারিতই নয়, জটিলও বটে। বিশেষতঃ মৃত্যুর পরের দীর্ঘ যাত্রা সম্পর্কে চিন্তা করা, লিপিবদ্ধ করা — বোধ করি, সহজ নয়।
  3. আমি এই প্রবন্ধে মনুসংহিতা, গরুড়পুরাণ, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ইত্যাদি থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছি, কিন্তু আপনাকে কোনও কিছুই বিশ্বাস করতে বলছি না। আমি নিজেও এইসকল বর্ণনার অনেকাংশের অর্থ ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারি না। বোধ, অনুভূতি ছাড়া বিশ্বাস অচল। অতএব, আপনি নিজের মতো করে বিশ্বাস–অবিশ্বাস অথবা জিজ্ঞাসা–অনুসন্ধান করবেন।

আর "মুক্তি"? তবে কি আমার "মোক্ষলাভ" হবে না গো?

দাবি পরিত্যাগ বা ডিসক্লেইমার্স কোনও লেখায় শুরুতে বা একেবারে শেষে থাকে। তবে, এইখানে শেষের পরেও একটা শেষ অংশ আছে। 

আপনি হয়তো খেয়াল করেছেন এই পরিচ্ছেদে দৈহিক মৃত্যুর পরবর্তী যাত্রা নিয়ে অনেক কথা লিখেছি, কিন্তু "মুক্তি" বা "মোক্ষ" নিয়ে কিছু লিখিনি। এই শেষ অংশে "মুক্তি" সম্পর্কে সংক্ষেপে লিখি (যদিও এই বিষয়টি একেবারেই সংক্ষেপে লেখার বিষয় নয়)। যেই ব্যক্তি মোক্ষলাভ করেছেন, গরুড়পুরাণ ও উপনিষদ্‌ মতে স্বাভাবিক আত্মার থেকে তাঁর যাত্রাপথ সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই আত্মা যমলোকের পথে যাত্রা করে না বা স্বর্গ–নরকের বিচার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায় না। পরিবর্তে, তাঁরা সরাসরি পরমাত্মায় বিলীন হয়ে যান।

এইখানে একটা তথ্য দিই। এই যে "মুক্তি" বা "মোক্ষ"-এর সম্পর্কে বললাম, সনাতন, বৌদ্ধ এবং আরও অনেক ধর্মমতে এইটাই জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য। যতদিন না নির্বাণ হচ্ছে ততদিন এই সংসারে বারবার ফিরে আসতে হবে। নাচে জন্ম, নাচে মৃত্যু, পাছে পাছে। বৃত্তাকার গতিতে চাকা ঘোরার মতো সুখ ও দুঃখের অবস্থা পরিবর্তিত হবে। জীবন কখনও রূপকথা, তো কখনও চুপকথা। চক্রাকারে ফিরে ফিরে আসবে। তাই জন্যই হয়তো আদি শঙ্করাচার্য হুঁশিয়ার করে বলেছিলেন— "ভজ গোবিন্দম্‌, ভজ গোবিন্দম্‌, ওহে মোহাচ্ছন্ন মন, এখনও তোমার সময় আছে। গোবিন্দ ভজনা করো, কৃষ্ণকে স্মরণ করো। ... ... ফুলের পাতায় থাকা জল যেমন অতিস্বল্প ও অস্থির, তেমনই মানুষের জীবন। প্রলোভন মনকে খুব চঞ্চল করে। জেনো, এই জগৎ ব্যাধি ও অহংকারে আক্রান্ত, দুঃখ–কষ্টে ভরা। ... ... ওগো আমার মূঢ় মন, আর সময় নষ্ট করো না। সময় থাকতে থাকতে... ভজ গোবিন্দম্‌।"

চতুর্থ অধ্যায়, প্রথম পরিচ্ছেদ এইখানেই শেষ করলাম।

চরৈবেতি।

দ্রষ্টব্য: এই লেখাটি আপনি স্বপ্না দত্ত ওয়েবসাইটেও পড়তে পারেন।

স্বপ্না দত্ত, আমার মা (Swapna Dutta, my Mother)


This page was last updated on: 9 August 2025
Number of revisions on this page: 2
Internet Archive Backup: See here