Showing posts with label মন. Show all posts
Showing posts with label মন. Show all posts

Tuesday, August 26, 2025

জপ — মনোযোগ সম্পর্কে কিছু কথা

জপ সিরিজের তৃতীয় অধ্যায় লেখা শুরু করছি। যে কোনও কাজ করার ক্ষেত্রে মনোযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বিষয়ে সকল শাস্ত্র এবং গুণীজনেরই মতামত এক।

মনোযোগ বিষয়টি খুব বড়ো। আমাদের বিভিন্ন লেখায় মনোযোগ সম্পর্কে আলোচনা ফিরে ফিরে আসবে। এই অধ্যায়ে মনোযোগ সম্পর্কে অল্প কিছু কথা লেখার চেষ্টা করবো।

শ্রীরামকৃষ্ণ এবং রাণী রাসমণির অমনোযোগ

রাণী রাসমণি (১৭৯৩–১৮৬১) কলকাতার জানবাজারের একজন প্রসিদ্ধ জমিদার ছিলেন। রাণী রাসমণির স্বামী রাজচন্দ্র দাসের মৃত্যুর পর রাণী রাসমণি জমিদারির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মানবদরদী রাসমণি মানবসেবা এবং জনহিতৈষী কাজের মাধ্যমে খ্যাতি লাভ করেন। রাসমণি দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দিরের প্রতিষ্ঠাত্রী এবং রামকৃষ্ণ পরমহংসের (১৮৩৬–১৮৮৬) অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।

১৮৫৫ সালে রাসমণি দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দির প্রতিষ্ঠা করার পর রামকৃষ্ণদেব এই মন্দিরের প্রধান পুরোহিত হিসাবে যোগদান করেন। এই সময় রামকৃষ্ণদেব কালী আরাধনায় এবং সাধনায় তাঁর সমস্ত সময় এবং শ্রম নিয়োগ করেছিলেন। এইখানে লক্ষণীয়, রাণী রাসমণি শ্রীরামকৃষ্ণের থেকে বয়সে প্রায় ৪৩ বছরের বড় ছিলেন।

একদিন রাসমণি দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দিরে দেবীদর্শনের জন্য এসেছেন। তখন দেবীর পূজা চলছে, রাসমণি কালীদর্শন করলেন। হঠাৎ সকলকে চমকে দিয়ে রামকৃষ্ণদেব এগিয়ে এসে মারলেন এক চড়। আশেপাশের সবাই চমকে উঠলো। এ কী করলেন রামকৃষ্ণ? অত বড়ো একজন জমিদারকে একজন পুরোহিত আঘাত করলেন?

এই ঘটনার অন্য একটি বর্ণনা আছে। সেইটি হলো রামকৃষ্ণদেব রাসমণিকে চড় মারেননি, বরং তাঁর পিঠে চাপড় মেরেছিলেন। 

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত গ্রন্থে ১৬ অক্টোবর ১৮৮২–এর দিনলিপিতে সরাসরি এই ঘটনার উল্লেখ আছে। রামকৃষ্ণদেবের নিজের স্মৃতিচারণায়—

একদিন রাসমণি ঠাকুরবাড়িতে এসেছে। কালীঘরে এল। পূজার সময় আসত আর দুই-একটা গান গাইতে বলত। গান গাচ্ছি, দেখি যে অন্যমনস্ক হয়ে ফুল বাচ্ছে। অমনি দুই চাপড়। তখন ব্যস্তসমস্ত হয়ে হাতজোড় করে রইল।

এরপর রামকৃষ্ণদেব রাণী রাসমণিকে শান্তভাবে জিজ্ঞেস করলেন— "এইখানে এসেও ওই ভাবনা?" রাসমণি কিছু উত্তর দিতে না পেরে সচেতন হয়ে পুজোর দিকে মনোযোগ দিলেন।

আসলে এইদিন যা হয়েছিল তা হলো রাণী রাসমণি দক্ষিণেশ্বরে এসে কালী আরাধনায় যোগদান করেছিলেন বটে, কিন্তু তাঁর মন পড়েছিল তাঁর বিভিন্ন কাজের দিকে — জমিদারি কাজের বিভিন্ন দায়–দায়িত্ব, লাভ–ক্ষতি, মামলা–মোকদ্দমা — এইসবের দিকে। মন্দিরে কালীপ্রতিমার সামনে উপস্থিত থেকেও তাঁর মনোযোগ ছিল না। সংবেদনশীল শ্রীরামকৃষ্ণ এই অমনোযোগিতা লক্ষ্য করেন এবং সেই অনুযায়ী রাণী রাসমণির মনোযোগ ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট হন।

শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসের প্রতিকৃতি, গেরুয়া বস্ত্র পরিহিত, একটি হাত আশীর্বাদ বা উপদেশ প্রদানের ভঙ্গিতে উঁচু করা।
রামকৃষ্ণদেব (১৮৩৬–১৮৮৬)। 
রাণী রাসমণিকে তাঁর অমনোযোগিতা সম্পর্কে সচেতন করেছিলেন। 
চিত্রসূত্র: উইকিমিডিয়া কমন্স। 

গুরুদ্বারে মস্তক আবরণ

আপনি হয়তো এই বিষয়ে জানেন এবং লক্ষ্য করেছেন যে গুরুদ্বারে (শিখ মন্দিরে) মাথা ঢেকে রাখা এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম। আপনি যদি পবিত্র গুরুদ্বারে প্রবেশ করেন তাহলে আপনার মাথা পাগড়ি, চাদর, রুমাল, দোপাট্টা, আঁচল জাতীয় বস্ত্র দ্বারা সম্পূর্ণ আচ্ছাদিত থাকা প্রয়োজন। 

এই গুরুদ্বারের অভ্যন্তরে মাথা ঢেকে রাখা শুধুমাত্র একটি বাহ্যিক পরিবর্তন নয়। এর পিছনে কয়েকটি কারণ বলা হয়। যেমন, ১) শ্রদ্ধা ও ভক্তি: শিখ ধর্ম, শিখ গুরু, গুরু গ্রন্থ সাহিবের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন, ২) অহংকার দমন: মাথা ঢাকা মানে নিজের অহংকারকে ঢেকে রাখা, বা "আমি নিজেকে অহেতুক বড়ো ভাববো না" – এই বিনয়ের প্রকাশ।

আমি নিজে শিখ ধর্মের উদারতার প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। বহুদিন ধরে নানা গুরুদ্বারে গিয়ে অভিজ্ঞতা লাভ করে এবং মনোনিবেশ করে, আমার খুব মনে হয় যে গুরুদ্বারে মাথা ঢেকে রাখার আরেকটা বড়ো কারণ আছে। 

দেখুন, মাথা হলো চিন্তা–ভাবনার প্রতীক। আমাকে যখন বলা হচ্ছে গুরুদ্বারে নিজের মাথা ঢাকা দাও, হয়তো বা তার অর্থ এই যে, এইখানে এসেছো, এখন তুমি তোমার অন্য সব চিন্তা বাদ দাও। নিজের মাথা ঢাকো — নিজের অন্য সব চিন্তা সরিয়ে ফেলো। 

পাঞ্জাবি গুরুমুখী: ਨਾਨਕ ਨਾਮ ਜਹਾਜ਼ ਹੈ, ਜੋ ਚੜ੍ਹੇ ਸੋ ਉਤਰੇ ਪਾਰ।
বাংলা: গুরু নানকের নাম জাহাজ তুল্য। যে সেই জাহাজে চড়ে সে পাড়ে নিশ্চয় পৌঁছয়।

তবে, মনোযোগের প্রয়োজন তো। পবিত্র গুরুদ্বারে এসেছো, মহান গুরুদের নিকটে রয়েছো। নিজের মাথা (চিন্তা–ভাবনা) আচ্ছাদিত করো। এখন শুধু গুরুর প্রতি মনোনিবেশ করার সময়। 

জপ এবং মনোযোগ

একটা সময় আমি বেশ কিছু বড় বড় অফিস বা ব্রেইনস্টর্মিং মিটিং–এ অংশগ্রহণ করেছি। এইসব ব্যয়বহুল আলোচনাসভায় আমার যা অভিজ্ঞতা হয়েছে এবং যা নিশ্চিত আপনিও খুব লক্ষ্য করেছেন যে অধিকাংশ মানুষ মনোযোগ দেন না। তাঁরা শারীরিকভাবে সভাস্থলে উপস্থিত, কিন্তু তাঁদের মন যেন অন্য কোথাও পড়ে আছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখেছি মিটিং চলাকালীন ল্যাপটপ আর মোবাইল নিষিদ্ধ করা হয়। তবে তা করে অংশগ্রহণকারীদের মনোযোগ বিশেষ কিছু বাড়ে বলে মনে হয় না।

আমাদের এই প্রবন্ধ সিরিজের প্রধান বিষয় জপ। জপের সময়ে মনোযোগ অত্যন্ত জরুরি। এই অধ্যায়ে দুইটি বর্ণনা করেছি। রাণী রাসমণির সাময়িক অমনোযোগিতা এবং গুরুদ্বারে মস্তক আচ্ছাদন সম্পর্কে অভিমত। যখন আমরা জপ করবো, অন্য সব চিন্তা বাদ দিতেই হবে। একাগ্র মনোযোগ প্রয়োজন। যদি একবারেই এই অবস্থায় পৌছনো না যায়, ধীরে ধীরে মনোযোগ বৃদ্ধির প্রচেষ্টা করতে হবে। নিজের মাথা ঢাকা দিতেই হবে।

জপ বিষয়ক তৃতীয় অধ্যায় এইখানেই শেষ করলাম। 

Japa (জপ)


This page was last updated on: 26 August 2025
Number of revisions on this page: 1
Internet Archive Backup: See here

Sunday, August 24, 2025

জপ — কী জপ করবেন?

জপ, নামজপ বা ধ্যানজপ সিরিজের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু করছি। এর আগে জপ সিরিজের প্রথম অধ্যায়ে জপের সংজ্ঞা, জপ করার কারণ ইত্যাদি আলোচনা করেছিলাম। দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রধান আলোচ্য বিষয়— কী জপ করবেন। বেশ কিছু উদাহরণ এবং বিবরণসহ বিস্তারিত এই বিষয়ে বলার চেষ্টা করবো।

জপ — শব্দের সন্ধানে

জপ করার জন্য আপনার প্রথমেই প্রয়োজন হবে একটা শব্দ। অথবা কয়েকটি শব্দ একত্রে, বা একটা নাম — যেইগুলোও আসলে শব্দই।

দেখুন, শব্দ ছাড়াও অন্যান্য জপ যেমন দৃশ্যজপ, অনুভূতিজপ ইত্যাদি হওয়া সম্ভব। তবে, শব্দজপই সর্বাধিক প্রচলিত, জনপ্রিয়, এবং তুলনামূলকভাবে সহজ। দৃশ্যজপ, অনুভূতিজপ ইত্যাদি এই অধ্যায়ের বিষয় নয়, তবে আপাতত একটা উদাহরণ দিই— ধরুন আপনার কোনও প্রিয় মানুষ। বারবার তাঁর মুখ আপনি কল্পনা করছেন। তাঁর হাসি বা অন্য কোনও দৃশ্য আপনার মনে ভেসে উঠছে। আপনি তাঁর নাম যে বারবার উচ্চারণ করছেন, এমন নয়। শুধু একটা দৃশ্য বারবার আপনার মনে ফিরে ফিরে আসছে। এইটা হলো দৃশ্যজপ। একই ভাবে যদি বিশেষ কোনও অনুভূতি যদি আপনি পুনঃপুনঃ স্মরণ বা অনুভব করেন, তাহলে সেইটা অনুভূতিজপ।

দৃশ্যজপ বা অনুভূতিজপ যে আলাদা করেই করতে হবে, এমন নয়। বিশেষ শব্দ জপের মাধ্যমেই আপনি নাম–রূপ, নাম–গুণ, রূপ–গুণ — ইত্যাদি স্তরও অভ্যাস করতে পারেন। আপাতত এই বিষয় নিয়েই বলি।

জপ — অর্থপূর্ণ নাকি অর্থহীন? 

একটি বা কয়েকটি শব্দ একত্রে নিয়ে জপ শুরু করা যাক। এই শব্দ অর্থপূর্ণ এবং অর্থহীন — দুটোই হতে পারে। সাধারণত অর্থ আছে এমন শব্দ জপ করা অধিক প্রচলিত। অর্থপূর্ণ শব্দ জপ করলে সেইটা মনের মাঝে একটা চিত্র কল্পনার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলে। ধরুন আপনি একটি নাম জপ করছেন, সেই নাম জপ করার সাথে সাথে আপনার মন নামের সাথে রূপও কল্পনা করছে। আমি একটা শব্দ (নাম) জপের মতো কয়েকবার বললাম—

যীশু, যীশু, যীশু, যীশু।

দেখুন এই নাম জপের সাথে সাথেই মনের মাঝে একটা রূপও ফুটে উঠলো। যীশুর কোনও পরিচিত চিত্র। হয়তো বা যীশুর নাম জপ করার সাথে সাথে ওনার জীবন সম্পর্কে বর্ণিত বিভিন্ন ঘটনা, ওনার বিভিন্ন বাণীও আপনার মনের মধ্যে ভেসে বেড়াতে শুরু করলো।

আরও একটি উদাহরণ দিই। 

সৎনাম ওয়াহেগুরু। 
পাঞ্জাবি গুরুমুখী: ਸਤਿਨਾਮ ਵਾਹਿਗੁਰੂ।

শিখধর্মের এই পবিত্র বাণী জপ করলে বোধ হয় মনের মধ্যে ধীরে ধীরে একটা সুন্দর আধ্যাত্মিক পরিবেশ গড়ে ওঠে। ওয়াহেগুরু বললাম তার মানে সাথে সাথেই ঈশ্বরের নির্দিষ্ট একটা চিত্র মনে ভেসে উঠলো, এমন নয়। শিখধর্মে ঈশ্বরের সর্বজনসম্মত চিত্র বা প্রতিমা নেই। এই নামজপের মাধ্যমে ঈশ্বরের নির্দিষ্ট রূপ না হোক, একটা সার্বিক পবিত্র পরিবেশ, একটা নির্মল বাতাবরণ মনের মধ্যে সৃষ্টি হয় বৈকি।

শিখধর্মের প্রথম গুরু, গুরু নানকের একটি ঐতিহ্যবাহী ছবি। তিনি শান্ত ও ধ্যানমগ্ন ভঙ্গিতে বসে আছেন। তাঁর সাদা দাড়ি, অলঙ্কৃত পোশাক ও পাগড়ি রয়েছে, মুখে শান্ত ও কোমল অভিব্যক্তি। পুরো ছবিটি শান্তি, ভক্তি এবং শিখ শিক্ষার আধ্যাত্মিকতার প্রতীক।
গুরু নানক — নামজপের ওপর অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
ঊনবিংশ শতাব্দীর চিত্র। 
সূত্র: উইকিমিডিয়া কমন্স।

অতএব, আপনি জপ করার সময় অর্থপূর্ণ শব্দ ব্যবহার করতে পারেন। যেমন—

বিষয়  জপের শব্দ 
ঈশ্বরের নাম 
(দৈব নাম) 
রাম, কৃষ্ণ, কালী, আল্লাহ, যীশু, বুদ্ধ, নানক, দুর্গা, ভবানী, প্রমুখ। একই নাম একাধিকবার বা একাধিক নাম একসাথে উচ্চারণ করা যায় যেমন হরেকৃষ্ণ, রাধাকৃষ্ণ, হরগৌরী। 
অনুভূতি প্রেম, শক্তি, বিজয়, শৌর্য, সাহস ইত্যাদি। এইরকম কোনও শব্দ বেছে নিতে পারেন। 
  • শিবোহম (আমি শিব), 
  • অহং ব্রহ্মাস্মি" (আমি ব্রহ্ম), 
  • চরৈবেতি (এগিয়ে চলো), 
  • বন্দেমাতরম্‌ (ভারত দেশমাতৃকাকে স্মরণ করে),
  • আল্লাহু আকবর (আল্লাহ মহান), 
  • লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (আল্লাহ ভিন্ন কোনও উপাস্য নেই), 
  • বুদ্ধং শরণম গচ্ছামি (আমি বুদ্ধের শরণে যাচ্ছি), 
  • হ্যালেলুইয়া (ঈশ্বরের মহিমা), 
  • বাবা নাম কেবলম্‌ (প্রভাতরঞ্জন সরকারের স্মরণে), 
  • রামকৃষ্ণ শরণম্‌ (রামকৃষ্ণদেবকে স্মরণ করে), 
  • জয় শ্রী গুরুমহারাজকি জয় ইত্যাদিও জপ করতে পারেন।
ঐতিহাসিক এবং বিশেষ ব্যক্তি শিবাজী মহারাজ, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, ঝাঁসির রাণী লক্ষ্মী, মাদার টেরেজা, মনসুর আল–হাল্লাজ, সক্রেটিস, আইজাক নিউটন — এইরূপ কোনও ব্যক্তির নাম যা আপনাকে অনুপ্রেরণা যোগায়। 
অথবা, কোনও ব্যক্তিগত প্রিয় মানুষের নাম বা আপনার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক। বাবা, মা, ছেলে, মেয়ে, গুরু, শিক্ষক–শিক্ষিকা, প্রিয়তম–প্রিয়তমা ইত্যাদি। 
বিশেষ শব্দ এবং বীজমন্ত্র হ্রীং, ক্লীং, ঐং, ক্রীং, গং (মহামায়া, ভুবনেশ্বরী, মহালক্ষ্মী, কৃষ্ণ, কালী, দুর্গা প্রমুখ দেবদেবীর বীজমন্ত্রসমূহ), রাঃ–স্বাঃ (অনুকূল ঠাকুরের ভক্তরা অনুশীলন করেন। "রাধাস্বামী"–এর সংক্ষিপ্ত রূপ)।
এছাড়া দীক্ষার সময় আপনার গুরু আপনাকে বিশেষ বীজমন্ত্র দিতে পারেন। 

এইভাবে আপনি কোনও নির্দিষ্ট শব্দ বা নাম সশব্দে, বা মনে মনে উচ্চারণ করতে পারেন। আপনি চাইলে সরাসরি কোনও অর্থ নেই এমন শব্দ, যেমন— ত্ররা, ঐযু, ওমি, ব্রীহ্মি ইত্যাদি জপ করতে পারেন। এই ক্ষেত্রে আপনি নির্দিষ্ট কোনও ধারণা বা রূপের সাথে নিজের জপকে আবদ্ধ করছেন না। যদি অর্থপূর্ণ শব্দ জপ করার সময় মন খুব চঞ্চল হয়, বা মনের মাঝে নানা চিন্তা এসে জপের গতিরুদ্ধ হয়, আপনি সরাসরি কোনও অর্থ নেই, এমন শব্দ জপ করতে পারেন। একইভাবে যদি আপনি রূপ–রস বাদ দিয়ে শুধু জপের শব্দে মনোনিবেশ করতে চান, আপনি এই পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারেন।

আমাদের জপের শব্দ অর্থপূর্ণ হোক বা না হোক — সবথেকে এবং একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমরা কতটা মনোযোগ এবং আন্তরিকতার সাথে নিয়মিত জপ করলাম। অনুশীলনের মধ্যে ভালোবাসা না থাকলে মহান ঈশ্বরের নাম বড় বড় বিশেষণসহ বলে গেলেও অগ্রগতি ধীরে হবে।

হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র

চৈতন্য মহাপ্রভু (১৪৮৬–১৫৩৪) ভারতীয় ভক্তি আন্দোলনের একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং পথপ্রদর্শক, যিনি ভক্তি ও নামজপের মাধ্যমে ঈশ্বরের স্মরণকে মানুষের মধ্যে প্রবলভাবে জনপ্রিয় করেছিলেন। তিনি হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র প্রদান করেছিলেন। 

হরে কৃষ্ণ, হরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ, হরে হরে।
হরে রাম, হরে রাম, রাম রাম, হরে হরে।

এই মহামন্ত্রটি শুধুমাত্র নাম বা শব্দের পুনরাবৃত্তি নয়। দুর্দান্ত ছন্দ, গতি, তাল, মাত্রা, শব্দচয়ন, অর্থসংযোগ — সব নিয়ে খুব শক্তিশালী এক মন্ত্র। আপনি কয়েকবার মহামন্ত্র জপ করেন দেখবেন আপনার উচ্চারণ আপনার শ্বাস–প্রশ্বাসের এবং হৃৎস্পন্দনের সাথে মিলেমিশে যাচ্ছে। আপনার কষ্ট হচ্ছে না। অন্য অনেক শব্দ জপ করার সময় খেয়াল করবেন যেন কষ্ট হচ্ছে, শ্বাস–প্রশ্বাসের গতি, বুকের ধুকপুকানি বেড়ে যাচ্ছে। এই এতবার জপ হলো, ওই অতবার জপ হলো — এইসব হিসেব মনকে কষ্ট দিচ্ছে। মহামন্ত্র জপের সময় আপনার সবকিছু অনেক সহজ এবং মোলায়েম মনে হবে। চৈতন্য মহাপ্রভু একেবারে বেছে বেছে সেরা ফুলগুলো দিয়ে পরম যত্নে এক মালা বানিয়ে দিয়েছেন। মহামন্ত্র জপের জন্য অত্যন্ত কার্যকর।

মহাজনো যেন গতঃ স পন্থাঃ

আমি ওপরে চৈতন্যদেবের মহামন্ত্রের উদাহরণ দিলাম। আপনি বিভিন্ন ধর্ম এবং সম্প্রদায়ের অনুশীলনে দেখবেন মহান জনেরা দারুণ সব মন্ত্র প্রদান করেছেন। শিবস্তোত্রম হোক, মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র হোক, বুদ্ধধর্মের ত্রিশরণ হোক — এইরকম সব মন্ত্রেই উৎকর্ষতা এবং উপকারিতা বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। 

আপনি চাইলে যে কোনও শব্দ বা বাক্য জপ করতে পারেন। তবে শাস্ত্র বলে "মহাজনো যেন গতঃ স পন্থাঃ" — মহাজনেরা যে পথে হেঁটেছেন সেই পথ অনুসরণ করা উচিত। তাই, আপনি আপনার পছন্দমতো যে কোনও ধর্মের, বা কোনও মহামানবের প্রদত্ত বাণী জপ হিসাবে ব্যবহার করতে পারেন।

শব্দের অর্থ ও মনের ওপর ক্রিয়া

একটা সুন্দর তথ্য দিই। একটা শব্দ যখন আপনি বারবার উচ্চারণ করছেন বা ব্যবহার করছেন, সেইটা আপনার মনের ওপর একটা ক্রিয়া করে। তাই ব্যবহারিক মনস্তত্ত্বের দিক দিয়ে দেখলে আপনি আপনার কোনও অনলাইন অ্যাকাউন্টে বা আপনার ডিভাইসে কী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করবেন, সেইটা একটু ভেবে স্থির করা উচিত। এই পাসওয়ার্ড বা পিন আপনি বারবার ব্যবহার করছেন, যদি আপনি একটি শক্তিশালী ও ইতিবাচক শব্দ বা পাসওয়ার্ড ব্যবহার করেন, তাহলে এটি আপনার মনের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। অন্যদিকে, নেতিবাচক বা দুর্বল শব্দ ব্যবহার করলে তা মানসিক শক্তি হ্রাস করতে পারে।

মনোবিজ্ঞানে প্রাইমিং (Priming) নামে একটি ধারণা রয়েছে। প্রাইমিং হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে একটি উদ্দীপক (যেমন একটি শব্দ) চিন্তা বা আচরণকে প্রভাবিত করে। 

জপ করার সময় ব্যবহৃত নাম, শব্দ, বা বাক্য চয়নের সময় মনোযোগ দেবেন। 

মুঘল যুগের একটি ঐতিহাসিক চিত্রকর্ম যেখানে সুফি সাধক মনসুর আল-হাল্লাজের মৃত্যুদণ্ড দেখানো হয়েছে। তাঁকে কাঠের ফ্রেমে বেঁধে রাখা হয়েছে, চারপাশে সৈন্য ও দর্শকরা দাঁড়িয়ে আছে। কেউ কেউ বেদনায় তাকিয়ে আছে, আবার কারও মুখে কঠোর অভিব্যক্তি। এই দৃশ্য তাঁর শহীদত্বের প্রতীক, যখন তিনি "আনা আল-হক" (আমি সত্য) উচ্চারণ করেছিলেন এবং সেই কারণেই তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
মনসুর আল–হাল্লাজ। 
শক্তিশালী বাণী আনা'ল-হক (أنا الحق) ঘোষণা করেছিলেন।
চিত্রসূত্র: উইকিমিডিয়া কমন্স।

প্রিয় ব্যক্তির নাম জপ করবো কি?

প্রিয় ব্যক্তির নাম জপ করতেই পারেন। গুরু, শিক্ষক–শিক্ষিকা, মা–বাবা প্রমুখ এঁদের নাম এবং এঁদের সাথে আপনার সম্পর্ক আপনি জপে ব্যবহার করতে পারেন। এই পদ্ধতিতে একটা সুবিধা হলো যেহেতু আপনার সেই ব্যক্তির সাথে প্রত্যক্ষ পরিচয়ের অভিজ্ঞতা আছে, আপনার মন অনেক সহজে ধারণা করে নিতে পারবে। মন দোদুল্যমান হবে না। তবে কিছু ক্ষেত্রে এই পদ্ধতিতে বিশেষ অসুবিধা হতে পারে। ধরুন, আপনি পছন্দ করেন এমন কোনও ব্যক্তিকে আপনি বারবার স্মরণ করছেন, কিন্তু কিছু দিন পর দেখলেন আপনি সেই ব্যক্তির কাছ থেকে আপনার প্রত্যাশা অনুযায়ী উত্তর বা ব্যবহার পাচ্ছেন না। হয়তো বা আপনার মনে হতে পারে তিনি আপনাকে তেমন সময় বা গুরুত্ব দিচ্ছেন না। এইরকম সময় আপনার জপ অনুশীলন খুব ধাক্কা পেতে পারে। হয়তো বা কিছু সময় পরে আপনি আপনার স্মরণ–মনন বন্ধ করে দেবেন। মা–বাবা, গুরু — এইরকম সম্পর্কে এই সমস্যা তেমন হবে না বলেই বোধ করি। অন্যান্য যেকোনো সম্পর্কে আপনার প্রত্যাশা যত বেশি, আপনার আশাহত হওয়ার, আঘাত পাওয়ার সম্ভাবনা তত বেশি। 

জপ বিষয়ক দ্বিতীয় অধ্যায় এইখানেই শেষ করলাম। 

Japa (জপ)


This page was last updated on: 24 August 2025
Number of revisions on this page: 1
Internet Archive Backup: See here

Wednesday, August 20, 2025

জপ — সংজ্ঞা? কেন করবেন? কখন করবেন?

জপ, নামজপ বা ধ্যানজপ বিভিন্ন ধর্মের প্রথা এবং আচার–অনুষ্ঠানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকে দেখলেও জপের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। সমাজে প্রচুর সংখ্যক মানুষের মধ্যে জপের প্রতি উৎসাহ এবং জপের অনুশীলন লক্ষ্য করা যায়।

জপ সম্পর্কে একটা প্রবন্ধ লেখার অনেকদিন ধরে খুব ইচ্ছে ছিল। এই প্রবন্ধ সিরিজের মূল লক্ষ্য জপ বিষয়ে বোধ্য–অবোধ্য সবকিছু জড়ো করে লেখা নয়। বরং, যতটা যা বুঝতে পারছি, অনুভব করছি, অভ্যাস করছি — বা শুধু যতটা আমি নিশ্চয়তার সাথে লিখতে পারি ততটাই — সেইগুলোই গুছিয়ে প্রাসঙ্গিক তথ্য ও রেফারেন্সসহ লেখার চেষ্টা করবো। 

এই লেখার বিভিন্ন অধ্যায়ে স্বাভাবিক কারণেই প্রচুর ধর্মীয় রেফারেন্স থাকবে। তবে মূল প্রচেষ্টা থাকবে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে জপ বিষয় নিয়ে আলোচনা করার। জপ বা নামজপ সম্পর্কে প্রথম অধ্যায় শুরু করছি।

জপ কী?

জপ একটা অনুশীলন যেখানে কোনও একটা বিশেষ শব্দ, নাম, বা মন্ত্র বারবার উচ্চারণ করা হয়। বিভিন্ন গতিতে, বিভিন্ন ছন্দে মনে, সশব্দে বা স্বল্প শব্দের সাথে পুনরাবৃত্তিই হলো জপ। নামজপ জপের অত্যন্ত জনপ্রিয় রূপ। রাম, কৃষ্ণ, বুদ্ধ, আল্লাহ ইত্যাদি নাম অনেকে জপমন্ত্র হিসাবে উচ্চারণ করেন। ঈশ্বরের নাম ছাড়াও, বিশেষ ব্যক্তি, প্রিয় ব্যক্তি, কোনও শব্দ, বাক্য, বা মন্ত্রও জপ করা যেতে পারে।

কাংগ্রা শৈলীর একটি ঐতিহ্যবাহী চিত্রকর্ম যেখানে কমলা-বস্ত্র পরিহিতা এক নারী ভক্ত সাধিকা তানপুরা কাঁধে নিয়ে বাঁশি বাজাচ্ছেন, যা ভক্তি ও আধ্যাত্মিকতার প্রতীক।
সাধিকা মীরা।
তাঁর ভক্তির প্রধান ভিত্তি ছিল অবিরাম নামজপ ও ভজন।
চিত্রসূত্র: উইকিমিডিয়া কমন্স। 

জপের প্রকারভেদ

জপ প্রধানত তিনরকম—

  1. বাচিক জপ: যখন মন্ত্র বা নাম স্পষ্টভাবে মুখে উচ্চারণ করা হয়।
  2. উপাংশু জপ: ঠোঁট নড়ে কিন্তু শব্দ শোনা যায় না, কেবল নিজে শোনার মতো।
  3. মানস জপ: একেবারে মনে মনে জপ করা হয়, ঠোঁট বা জিহ্বা নড়ে না।

জপ কেন করবেন?

আপনি কেন জপ করবেন, বা কতদিন, কতক্ষণ জপ করবেন, তা আপনাকে নিজেকেই ঠিক করতে হবে। 

যদি ইচ্ছা না হয়, বা জপের মধ্যে আপনি কোনও বিশেষত্ব না দেখেন, তবে হয়তো জপ না করাই ভালো। 

যদি আপনার ইচ্ছা বা উৎসাহ হয় আপনি জপ করতে পারেন। জপ করার কয়েকটি কারণ নীচে দিচ্ছি। এইগুলি দেখতে পারেন, তবে স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে তাগিদ না এলে আর কারণ খুঁজে না পেলে জপ বেশিদিন চলবে না হয়তো। অল্প কয়েকদিন পরেই হয়তো দেখবেন  জপ করতে ভুলে যাচ্ছেন বা জপ করতে ইচ্ছে করছে না। সকালবেলা থাক, সন্ধ্যেবেলা করবো। আজ থাক, কাল করবো। — এইভাবেই চলতে থাকবে। তাই, আপনি কেন জপ করবেন, তা আপনার পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপট অনুযায়ী নিজেই ঠিক করুন।

জপ করার কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা হয়ে থাকে। জপ অনুশীলন মানসিক, আত্মিক, এবং শারীরিক — তিন স্তরে আমাদের জীবনে প্রভাব ফেলে। এটি শুধু ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়া নয়, বরং একটি মনসংযমের পদ্ধতি, যা মানুষের দেহ, মন এবং চেতনার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। জপ করার মূল উদ্দেশ্য হলো মনকে নিয়ন্ত্রণে আনা, চেতনার গভীরে প্রবেশ করা এবং অস্থিরতাকে কমানো।

আমরা যদি মনোসংযোগ বাড়াতে চাই, অথবা কোনও ব্যক্তি, বস্তু বা বিষয়ের প্রতি মনটাকে একাগ্র করতে চাই, তবে জপ এক কার্যকরী পদ্ধতি। কিন্তু, কেন আমরা একটা নির্দিষ্ট বিষয়ের প্রতি মনোনিবেশ করতে চাইবো? কারণ কী? 

» হতে পারে যে চারপাশের নানা বিষয়, ঘটনা আমাদের বিব্রত করে। চেষ্টা করেও মনকে শান্ত করতে পারছি না। মন ক্ষণে রুষ্ট, ক্ষণে তুষ্ট। রুষ্ট তুষ্ট ক্ষণে ক্ষণে। 

» হতে পারে যে মনের মধ্যে একটা তীব্র ইচ্ছে রয়েছে কোনও কিছুর প্রতি নিরবচ্ছিন্ন মনোসংযোগ করার। ভালোবাসার। অঝোরে যেমন বৃষ্টি ঝরে — ঠিক তেমন। ঢেকে রাখে যেমন কুসুম, পাপড়ির আবডালে ফসলের ঘুম — ঠিক তেমন।

» হতে পারে আমাদের মনের মধ্যে অনিয়ন্ত্রিত চিন্তা, একটানা বকবক নিয়ে আমরা নিজেরাই বিব্রত। ভাবতে চাই না তবু ভেবে ফেলি। করতে চাই না তবু করে ফেলি। প্রতিটা কাজ আগে একটা চিন্তা হিসাবে থাকে — তারপর সেই চিন্তা কাজ হিসাবে প্রকাশ পায়। মনের মাঝে অনিয়ন্ত্রিত চিন্তার বুদবুদ রয়েছে যখন, করতে না চাওয়া কাজ করে ফেলাই স্বাভাবিক। পরে হয়তো আক্ষেপ হয় — কেন ভাবলাম, কেন করলাম?

» হতে পারে যে আমরা হয়তো সদ্য কোনও আঘাত পেয়েছি। মন খুব চঞ্চল — ব্যথিত। মনটাকে শান্ত করতে চাইছি — যন্ত্রণা কমাতে চাইছি।

» হতে পারে আমরা শুধু বর্তমানে মনোসংযোগ করতে চাইছি। অতীতের স্মৃতিচারণা নয়, ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা নয়, কাল্পনিক দুনিয়ায় অলস ভ্রমণ নয় — শুধু বাস্তবে বর্তমানে থাকতে চাইছি — বাঁচতে চাইছি।

উপরোক্ত সবকটিই পরিস্থিতি এবং এইসকল ছাড়া আরও বিষয় জপ করার কারণ হিসাবে গণ্য হতে পারে। 

জপ করার জন্য জপ করা — মানে জপ করতে ভালো লাগে তাই জপ করা — এইটাও জপ করার একটা অত্যন্ত বড় এবং শক্তিশালী কারণ। একটা নির্দিষ্ট সময় ধরে জপ অনুশীলন করলে অভ্যাসবশত মন নিজে থেকেই নামজপ শুরু করে দেয়। গুরু নানক "অজপা" অবস্থার উল্লেখ করেছিলেন যখন জপ স্বতঃস্ফূর্তভাবে হতে থাকে, বাহ্যিক চেষ্টার প্রয়োজন হয় না।

জপের ছন্দ

একই শব্দ, নাম, বা মন্ত্র বারবার উচ্চারণ বা জপ করলে একটা ছন্দের সৃষ্টি হয়। একজন ব্যক্তি নিজেও বিশেষ কোনও ছন্দে জপ করতে পারেন। ধরুন, একটা একজন ব্যক্তি ॐ প্রণবমন্ত্র জপ করছেন। এখন তিনি এই জপ বিভিন্ন রকম ভাবে পুনরাবৃত্তি করতে পারেন। যেমন—

ॐ — ॐ — ॐ — ॐ ... 
এইখানে ॐ একবার করে স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করা হচ্ছে।

অথবা,

ॐ ॐ ॐ ॐ 

ॐ ॐ ॐ ॐ 

ॐ ॐ ॐ ॐ 

ॐ ॐ ॐ ॐ

এইখানে ॐ একসাথে চারবার করে উচ্চারণ করা হচ্ছে। বিরাম নিয়ে আবার জপ শুরু করা হচ্ছে। 

এইটা এইভাবেও করা যেতে পারে— ॐ ॐ ॐ ॐ — চার বার জপ করে স্বল্পবিরাম। ৪×৪=১৬ বার অথবা ৪×২৭=১০৮ বার অথবা ৪×২৫২=১০০৮ বার জপ করার পর দীর্ঘ বিরাম। 

বৌদ্ধধর্মের একটা উদাহরণ দিয়ে বলি—

বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি।

 ধম্মং শরণং গচ্ছামি।

 সংঘং শরণং গচ্ছামি।

এই ত্রিশরণ মন্ত্র একসাথে বা শুধু প্রথম অংশ "বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি" ছন্দসহ জপ করা যেতে পারে।

জপ গণনা এবং গণনাবিহীন জপ

১০৮ বার বা ১০০৮ বার জপ করা সাধারণত প্রচলিত। তবে আপনি অন্যান্য সংখ্যা ৫১, ১০১, ১০০১, বা যে কোনও লক্ষ্য স্থির করতে পারেন। ১ বা ৪ দিয়ে যে ভাগ করতে হবে, এমন নয়। আপনি চাইলে ২, ৪, ৮, ১৬ দিয়ে ভাগ করেও সাইকেল করতে পারেন। ১–এর সাইকেলে অভ্যাস (ॐ — ॐ — ॐ — ॐ ... ) সবথেকে সহজ। আপনি যত বড় সাইকেল করবেন হয়তো কঠিনটা তত বেশি হবে। 

আপনাকে যে সংখ্যা গুণে গুণেই করতে হবে তার কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। অনেকে জপ করার সময় কতবার জপ করলেন তার একদমই হিসেব রাখেন না। তাঁদের মত এই যে জপ করার সময় প্রতি মুহূর্তে এক, দুই, তিন, চার করে গুণে গেলে মনোযোগ আর মনের শক্তি জপ এবং জপের বিষয় থেকে এই গণনাতেই বেশি চলে যায়। 

একই ভাবে অনেকে জপ করার ক্ষেত্রে জপের সময়ও, মানে কতক্ষণ জপ করলেন, তাও লক্ষ্য করেন না। এইখানে যুক্তি, ধরুন আপনি আপনার অত্যন্ত প্রিয় মানুষের সাথে কিছুটা সময় কাটানোর সুযোগ পেয়েছেন, আপনি কি মিনিট সেকেন্ডের হিসেব রাখবেন? এক বা দুই ঘণ্টা হয়ে গেলেই নিজেকে বাহবা দেবেন? নাকি যতটা বেশি সময় সম্ভব আপনি আপনার প্রিয় মানুষের সাথে থাকার চেষ্টা করবেন? তাহলে, জপ, ধ্যান ইত্যাদির ক্ষেত্রেই বা সময়ের হিসেব রাখা কেন?

সঠিক বক্তব্য। এইরকম করতে পারলে খুব ভালো হয়। সাথে সাথে, বাস্তব সমস্যাও থাকতে পারে। একটা কথা শুধু ভালো লাগে বলে বলে দিলাম, করতে পারলাম না, তাহলে তো কিছু কাজের কাজ হয় না। করতে পারলে তো খুবই ভালো, নইলে দেখবেন প্রথম কয়েকদিন পর জপের বা ধ্যানের সময় কমে আসছে, বা আমরা জপ করতে ভুলে যাচ্ছি। আর ঐদিকে আমরা সময়ের বা জপের হিসেবও রাখছি না। ফলে, যারা গুণে বা সময় ধরে জপ করছেন তাঁদেরও প্রচেষ্টা অর্থপূর্ণ — তাঁরা নিজেদের অনুশীলনকে আরও বেশি শৃঙ্খলাবদ্ধ করার চেষ্টা করছেন। 

আমরা গুণে অথবা না গুণে, অথবা মিশ্রভাবে জপ করতে পারি। এই মিশ্রভাবে করার অর্থ একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা। ধরুন, দিনে কমপক্ষে ১০৮ বার বা ১৫ মিনিট জপ করবোই। এই অংশটার হিসেব রাখবো। আর তারপর সারাদিন কতক্ষণ বা কতবার জপ করবো তার আর কোনও হিসেব রাখবো না। এতে রোজকার শৃঙ্খলাও হলো, আর অহেতুক প্রতি মুহূর্তে সংখ্যা গুনে নিজের মনোযোগ নষ্ট করা হলো না।

যেই পদ্ধতি আপনার সুবিধা হবে এবং আপনি আন্তরিকভাবে করতে পারবেন, সেই পদ্ধতিতেই জপ করবেন।

জপের সময় — কখন জপ করবেন?

জপের বাঁধাধরা নির্দিষ্ট সময় নেই। আপনার যখন ইচ্ছে তখন জপ করতে পারেন। নিজের সুবিধের জন্য প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট সময়েও জপ করতে পারেন।

অনেকে ব্রহ্মমুহূর্ত, ভোর সাড়ে তিনটে থেকে সূর্যোদয়ের আগে অবধি, জপ করেন। অনেকে সকালবেলা তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে স্নান করে জপ করেন। অনেকে সন্ধ্যাকালীন প্রার্থনার সময় জপ করেন। আবার অনেকে রাতে শুয়ে পড়ার পর জপ করেন। এইক্ষেত্রে লক্ষ্য থাকে যে যতক্ষণ না ঘুম আসছে ততক্ষণ জপ চালিয়ে যাওয়া। তারপর যখন ঘুম এলো তো এলো।

অনেকে বিশেষ তিথি বা মুহূর্তে, যেমন একাদশী, পূর্ণিমা, কোনও পুজো–পার্বণ, নিজের বা প্রিয় মানুষের জন্মদিন, সূর্যগ্রহণ–চন্দ্রগ্রহণ এই সব সময়ে জপের পরিমাণ বাড়িয়ে দেন। অনেক ধর্মপ্রাণ মুসলমান রমজান মাসে রোজা রাখার সময় একনিষ্ঠভাবে অবিরাম জিকির করেন — আল্লাহর নাম, সিফত (গুণ) বা বিশেষ বাক্য (যেমন আল্লাহু আকবর) পুনরাবৃত্তি করেন।

অনেককে দেখেছি কিছু কাজ শুরু করার আগে, বা করার সময় জপ করেন। সবথেকে বেশি দেখা যায় দুপুরে বা রাতে খাবার খাওয়ার আগে নির্দিষ্ট সংখ্যক বার ঈশ্বর বা অভীষ্ট জপ করা। এছাড়াও কোনও বড় কাজ বা প্রজেক্ট শুরুর আগে, কোথাও যাত্রা শুরু করার আগেও অনেককে জপ করতে দেখা যায়। ছাত্র–ছাত্রীদের মধ্যে পরীক্ষা কেন্দ্রে পরীক্ষা শুরুর আগে ভগবানের নামজপ করার প্রবণতা লক্ষ্য করে থাকবেন। 

অনেকে যখন একলা থাকেন বা কিছু কাজ থাকে না — অলস মস্তিষ্ক যেন শয়তানের কারখানা না হয়ে যায় — জপ করেন।

অনেক সময় অনেকের সাথে কথা বলতে গিয়ে দেখি অহেতুক বাজে বকছেন। কিছু সময় এড়ানোও যায় না, কিন্তু স্পষ্ট বুঝতে পারা যায় যে অহেতুক বাজে বকা হচ্ছে। এরকম সময়ে এক উপায় হচ্ছে— যা হচ্ছে হোক। একজন গলার আওয়াজ চড়ালে আমি আরও বেশি গলার আওয়াজ চড়াব। একজন "আমি জানি, আমি এইটা করেছি, আমি এইটা করতে পারি" বললে তাকে টেক্কা দেওয়ার জন্য "আমি আরও জানি" দাবী করবো। মানে পুরোপুরি সেই সময়ের আবেগ এবং অহংপ্রদর্শনের লড়াইতে নেমে পড়া। আরেকটা উপায় হলেও হতে পারে। অযথা চিৎকার প্রতিযোগিতায় না নেমে জপে মনোনিবেশ করা এবং ন্যূনতম উত্তর দেওয়া। এইরকম অভ্যাস করলে এইক্ষেত্রে বড়জোর যা হবে অন্যজনের মনে হতে পারে আপনি হয়তো তাঁর কথা মন দিয়ে শুনছেন না। বিশেষত যখন দেখা যাবে একজন আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আপনার ওপর রাগারাগি, গালাগালি করছেন, আর তার উত্তরে আপনি রেগে যাচ্ছেন না — শান্তভাবে উত্তর দিচ্ছেন — স্বাভাবিকভাবেই একটা আচরণের পার্থক্য দেখা যাবে। 

অনেকে মনের বিশেষ বৃত্তির সাথে লড়াই করতে জপ করেন। যেমন, মনের মাঝে পরকীয়া যৌনচিন্তা এলেই, সেটা থামাতে অনেকে জপ বা প্রার্থনা করেন। একই ভাবে অন্যের ক্ষতি করার চিন্তা, বা কোনও ব্যক্তির সর্বনাশ হলে আমার কত আনন্দ হবে — এইরকম নেগেটিভ চিন্তা মনে এলে জপ বা প্রার্থনা করা যেতে পারে।

চৈতন্য মহাপ্রভু। হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র প্রদান করেছিলেন।
চিত্রসূত্র: উইকিমিডিয়া কমন্স

নিয়মানুবর্তিতা

জপের ক্ষেত্রে (আসলে সব কাজেই) নিয়মানুবর্তিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হঠাৎ করে জপ শুরু করলাম, প্রথম দিন ১০,০০০ বার, দ্বিতীয় দিন ৬,০০০ বার জপ করলাম, তৃতীয় বা চতুর্থ দিন থেকে আর করলামই না — এইরকম করলে অগ্রগতি বোধ হয় ধীরে হবে।

নিয়মানুবর্তিতা প্রয়োজনীয়। এর মানে এই নয় প্রতিদিন বা দিনে দুইবেলাই জপ করতে হবে। তবে, নিজের মতো করে একটা নিয়মানুবর্তিতা অবশ্যই প্রয়োজন।

কষ্ট করে দাঁত–মুখ খিঁচিয়ে জপ

আনন্দমার্গের প্রতিষ্ঠাতা প্রভাতরঞ্জন সরকার লক্ষ্য করেছিলেন যে জপ করার সময় অনেকে দাঁত মুখ খিঁচিয়ে জোর করে করেন — যেন খুব কষ্ট হচ্ছে। প্রভাতরঞ্জন সরকার যতটা সম্ভব স্বাভাবিকভাবে ধীরে ধীরে জপ করতে পরামর্শ দিয়েছেন।

এই পর্যবেক্ষণ এবং পরামর্শ যথেষ্ট যুক্তিযুক্ত। আমরা জপ ধ্যানের সময় এই অসুবিধা হয়তো অনুভব করেছি। সারা বিশ্বে "মাইন্ডফুলনেস" এখন প্রচুর চর্চা হচ্ছে। আমরা যদি "মাইন্ডফুলনেস" অনুশীলন শুরু করি সবথেকে আগে হয়তো খেয়াল করবো আমাদের মন আগের থেকে বেশি অস্থির হয়ে যাচ্ছে। ধ্যান যখন শুরু করবো, হয়তো নজরে পড়বে যে আগে হয়তো ২০–৩০ মিনিট এমনিই বসতে পারতাম, ধ্যান শুরু করার পর যেন ৫ মিনিটও এক জায়গায় চুপ করে বসতে পারছি না। স্বামী বিবেকানন্দ "রাজযোগ" এবং "পাতঞ্জল যোগসূত্র" বর্ণনা করার সময় বলেছেন যে মনকে শান্ত করার প্রাথমিক অবস্থায় মনে অনেক চিন্তা ভাবনা বিক্ষিপ্তভাবে ঘুরে বেড়ায়।

শান্তভাবে নিয়মিত অভ্যাস এইক্ষেত্রে উপকারী। খুব কষ্ট করে দাঁত মুখ খিঁচিয়ে জপ না করাই ভালো। একদিনেই এক লাখ বার জপ করতেই হবে এমন দিব্যি কেউ দেয়নি। আস্তে আস্তে স্বতঃস্ফূর্ত এবং আন্তরিকভাবে জপ করুন। 

প্রথম অধ্যায় এইখানেই শেষ করলাম। পরবর্তী অধ্যায়গুলিতে জপ সংক্রান্ত অন্যান্য বিষয় তুলে ধরার চেষ্টা করবো।

Japa (জপ)


This page was last updated on: 20 August 2025
Number of revisions on this page: 2
Internet Archive Backup: See here